দুই দশকের ক্ষমতার ছায়া: এলজিইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর অভিযোগের ঝড়

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডি—যেখানে সারা দেশে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, স্কুল ভবন, আশ্রয়কেন্দ্র, বাজার উন্নয়নসহ প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলে। সেই বিশাল প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে আছেন জাবেদ করিম। আর তাঁকে ঘিরেই এখন নানা স্তরে বিস্তর প্রশ্ন, অভিযোগ আর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগের তালিকা এতটাই বড় যে শুধুই একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়—এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও সততা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, জাবেদ করিমের পুরো পথচলাই ছিল নানা বিতর্কে ঘেরা। শুরু নিয়োগ অনিয়ম দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে—কুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই তিনি নাকি এলজিইডির জিওবি খাতে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান। তখন প্রচলিত নিয়ম ছিল, বিএসসি পাস ছাড়া নিয়োগ নয়। কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় অনেকে এটিকে বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করেন। এলজিইডির ভেতরকার কিছু কর্মকর্তার মতে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির তারিখ, কুয়েটের ফল প্রকাশ, নির্বাচিত তালিকা ও যোগদানের সময় মিলিয়ে দেখলে অসংগতিটা চোখে পড়ে স্পষ্টভাবেই।

এরপর শুরু হয় তাঁর দ্রুত উত্থান। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জিয়া উল হক জিয়ার ঘনিষ্ঠতা পাওয়া যায় তাঁর নামে। অভিযোগ রয়েছে—একজন জুনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হয়েও তিনি লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। এমনকি যিনি আগেই দায়িত্বে ছিলেন, তাঁকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে জাবেদ করিমকে বসানো হয়। তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বলে শোনা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপ কাজ করায় নিয়মও টিকতে পারেনি। সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয়—এই অতিরিক্ত দায়িত্ব ছয় মাস নয়, প্রায় পাঁচ বছর ধরে টিকে ছিল। প্রবীণ কর্মকর্তারা বলেন, এখান থেকেই এলজিইডির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভাঙতে শুরু হয়।

এ সময়টাকে অনেকে ‘কমিশন বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ’ হিসেবেও উল্লেখ করেন। অভিযোগ—কার্যাদেশ পেতে ৮–১০% কমিশন দিতে হতো ঠিকাদারদের। একই রাস্তার নামে একাধিকবার বরাদ্দ আদায়, মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, হাতের লেখা টেন্ডারের মাধ্যমে সবকিছু একক আধিপত্যে চালানো—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে শোনা যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এই সময় লক্ষ্মীপুরেই নাকি শত কোটি টাকার বেশি অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে।

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি দমন অভিযানের সময় জাবেদ করিমের নাম নাকি গ্রেফতার তালিকায় ছিল। একই অভিযোগে বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রানা গ্রেফতারও হন। কিন্তু জাবেদ করিমের ক্ষেত্রে ঘটনাটা নাকি ভিন্ন। অভিযোগ—তাকে দ্রুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়, যাতে গ্রেফতার এড়ানো যায়। খুব অল্প সময়ে ফাইল-নোটিং, অনুমোদন, ভিসা সব সম্পন্ন হয়। পরে দেশে ফিরে আবারও তিনি এলজিইডির ক্ষমতাকেন্দ্রে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

আবার আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের সময়েও তাঁর প্রভাব ছিল বলেই বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। অভিযোগ ওঠে—গণভবনে অবাধ যাতায়াত, দলীয় তহবিলে বড় অঙ্কের অনুদান, বড় প্রকল্পে অপরিসীম কর্তৃত্ব, এমনকি নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর তিনি নাকি ভিন্ন পরিচয় তুলে ধরে নিজেকে জাতীয়তাবাদী ধারায় অবস্থান করছেন—শুধু ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে।

দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি উঠে আসে। দেশের সবচেয়ে বড় মানবিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নাকি ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। মান কম, কাজ কম করে পুরো বিল নেওয়া, রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের লোকদের (বিশেষ করে কিছু এপিএসের) মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ—এসব অভিযোগ শোনা যায়। শুধু এই প্রকল্প থেকেই নাকি শত কোটি টাকার বেশি লোপাট হয়েছে। আরও বড় অভিযোগ—তিনি নাকি দেশে-বিদেশে পাচার করেছেন হাজার কোটি টাকা এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এছাড়া সড়ক-সেতুর রক্ষণাবেক্ষণেও ছিল নানা অনিয়মের অভিযোগ। দায়িত্বে থাকার সময় বাস্তবে রাস্তাঘাটের তেমন কোনো সংস্কার হয়নি, কিন্তু কাগজ-কলমে সব ঠিকঠাক দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষায়—এই সময়টা ছিল “রক্ষণাবেক্ষণহীন রক্ষণাবেক্ষণের অধ্যায়”, যেখানে দুর্নীতি পদ্ধতিগত হয়ে ওঠে।

এলজিইডির ভেতরে আরও গুঞ্জন রয়েছে—বড় প্রকল্পের পরিচালক হতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো। বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়নেও নাকি বড় অঙ্কের টাকা লেগেছে। অনেকেই দাবি করেন—এই পুরো সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন জাবেদ করিম। তাঁদের প্রশ্ন—যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানজুড়ে এত ক্ষোভের কারণ কী?

সরকারি চাকরিজীবীর মাসিক বেতন যেখানে ৮০–১২০ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ—এ অভিযোগ সকলকে অবাক করে। দেশে-বিদেশে সম্পদ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়ি, প্লট—সবকিছুর মধ্যেই নাকি অস্বাভাবিক আয়ের প্রমাণ রয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি—দুদক নীরব, মন্ত্রণালয়ও উদাসীন।

প্রশ্ন উঠছে—এলজিইডির মতো দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সংস্থার অভ্যন্তরে যদি এভাবে নিয়োগ অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্প লুট, পোস্টিং-বাণিজ্য আর অর্থপাচারের অভিযোগ পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ে—তাহলে দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায়?

এই সব অভিযোগের বিষয়ে জাবেদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *