বদলি নীতিমালার বাইরে এক প্রকৌশলী: গণপূর্তে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের দুই দশকের ‘ঢাকা রাজত্ব’

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরির বদলি নীতিমালা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অন্যতম মূল ভিত্তি হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে সেই নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এক নির্বাহী প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে বদলি বিধি যেন অলিখিতভাবে অকার্যকর ছিল। তিনি হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য বদলিকৃত ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করা এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বদলি যেন কখনোই বাধ্যতামূলক ছিল না।

গণপূর্ত সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে অধিদপ্তরে যোগদানের পরই তিনি এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশে ঢাকায় পোস্টিং লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জোন ও প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী শতাধিক প্রকৌশলীকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি হতে হয়েছে, সেখানে স্বর্ণেন্দু শেখরের জন্য ঢাকাই যেন হয়ে ওঠে স্থায়ী কর্মস্থল—যেন এটি তার বাপ-দাদার জমিদারি।

ঢাকায় অবস্থানকালেই তিনি দলীয় লবিং ও প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক সুবিধাজনক পদায়ন নিশ্চিত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, উন্নয়ন বা মেরামত প্রকল্প মানেই সেখানে কোটি কোটি টাকার কাজ, আর সেই কাজ ঘিরেই গড়ে ওঠে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ। অভিযোগ রয়েছে, বহু প্রকল্পে মাঠ পর্যায়ে কার্যত কোনো কাজ না করেই কাগজে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্তা সিন্ডিকেটের মধ্যে সেই অর্থ ভাগাভাগি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের।

তাদের আরও দাবি, গত দুই অর্থবছরের টেন্ডার ও বিল সংক্রান্ত নথিপত্র নিরীক্ষা করা হলে এই অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলতে পারে। কাজের মান যাচাই না করেই বিল অনুমোদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার দায়িত্বে থাকাকালে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলকে নিয়মিত সচিবালয়ে অবস্থান করতে দেখা যেত বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। নিজ কার্যালয়ে তাকে পাওয়া যেত না বললেই চলে। ‘সচিবের একান্ত লোক’ হিসেবে পরিচিত থাকার কারণে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনাকেও উপেক্ষা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মৌখিক সতর্কবার্তাও তার কাছে গুরুত্বহীন ছিল বলে দাবি সহকর্মীদের।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল খুলনা জেলার এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান। তার পিতা অর্ধেন্দু শেখর মন্ডল ছিলেন সাতক্ষীরার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। দলীয় পরিচয়ের সুবাদে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরে অঘোষিত ‘সুপারম্যান’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ সূত্রের দাবি, তিনি সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। একই সঙ্গে আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগেও তার সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল নিয়ন্ত্রকের মতো—এমন অভিযোগ রয়েছে। উপসহকারী থেকে নির্বাহী পর্যায়ের বহু প্রকৌশলীর বদলি ও পোস্টিংয়ের পেছনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব কাজ করেছে বলে সূত্র জানায়। পদায়ন মানেই মোটা অঙ্কের লেনদেন—এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল অর্থের বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন যদি জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংকিং তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালায়, তবে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের চাপেই তাকে অবশেষে ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও তিনি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ঠিকাদার ও দোসরদের সঙ্গে নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী বলয়ের পুনর্বাসনের কৌশলগত তৎপরতাও চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরে যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন দলীয় আশ্রয়ে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সাম্রাজ্য টিকে থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই—এতদিন কারা তাকে আগলে রেখেছিল? কার স্বার্থে বদলি নীতিমালা অকার্যকর ছিল? আর কার ছত্রছায়ায় এই ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল?
এখন সময় এসেছে অদৃশ্য বদলি-রুলের আড়ালে থাকা এসব দুর্নীতির গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *