বাঁধ রক্ষার অর্থে ম্যুরাল নির্মাণ? পাউবোর প্রবীর কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে নোটিশ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে বাঁধ মেরামতের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কাজে ব্যয় করার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে আবারও লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে অভিযোগের বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এর আগেও প্রবীর কুমার গোস্বামীকে ঘিরে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর একটি লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও আগের অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা দৃশ্যমান নিষ্পত্তি পাওয়া যায়নি বলে নোটিশদাতার দাবি।

এবারের পুনঃলিগ্যাল নোটিশে মূল অভিযোগ করা হয়েছে বাঁধ মেরামতের অর্থ ব্যবহার করে ম্যুরাল নির্মাণ নিয়ে। নোটিশে দাবি করা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালনের সময় বাঁধ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও দাবি করা হয়, যশোর, কক্সবাজার ও সিলেটে দায়িত্ব পালন করার সময় এ ধরনের ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোন প্রকল্পের কত টাকা ম্যুরাল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে, কোন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ হয়েছে এবং এসব অর্থ কোন বিল বা প্রকল্পের আওতায় ছাড় করা হয়েছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত নথি নোটিশে উল্লেখ করা হয়নি।

নোটিশদাতার অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মূল দায়িত্ব হচ্ছে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ ও পানি ব্যবস্থাপনা। এসব কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থ যদি অনুমোদিত প্রকল্পের বাইরে অন্য কোনো স্থাপনা বা সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম হতে পারে।

বিশেষ করে ম্যুরাল নির্মাণের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কোনো প্রকল্প ছিল কি না, থাকলে সেই প্রকল্পের অর্থের উৎস কী ছিল এবং বাঁধ মেরামতের বরাদ্দ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

নোটিশে আরও অভিযোগ করা হয়, বাঁধ মেরামতের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কাজে চলে যাওয়ায় কিছু এলাকায় প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি। কোথাও কোথাও কাজ আংশিক অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। এর ফলে পরবর্তী বন্যা মৌসুমে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ঝুঁকিতে পড়েন এবং বন্যা বা পানির কারণে বিভিন্ন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে নোটিশদাতার অভিযোগ।

তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক হিসাব নোটিশের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বাঁধ মেরামতের টাকা সত্যিই ম্যুরাল নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, কত টাকা ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এর ফলে কোনো প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নোটিশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশদাতার দাবি, সরকারি দপ্তর চত্বরে ম্যুরাল নির্মাণের ফলে পরবর্তী সময়ে সরকারি স্থাপনা ও সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বা সরকারি তদন্তের তথ্য নোটিশে উল্লেখ করা হয়নি।

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, আগের নোটিশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং বর্তমান নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। এ জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া বা লিখিতভাবে অবহিত করা না হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত ফোরামে যাওয়ার কথাও নোটিশে জানানো হয়েছে।

এদিকে অভিযোগের মূল বিষয় হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে, যশোর, কক্সবাজার ও সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে প্রবীর কুমার গোস্বামীর অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ডিপিপি, প্রশাসনিক অনুমোদন, অর্থছাড়ের কাগজপত্র, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার এবং কাজের পরিমাপ বই যাচাই করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

একই সঙ্গে যেসব স্থানে ম্যুরাল নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নির্মাণ ব্যয় কোন খাত থেকে এসেছে এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কে ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রমাণ হয় যে বাঁধ মেরামত বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বরাদ্দ অর্থ অনুমোদিত খাতের বাইরে ব্যয় করা হয়েছে, তাহলে বিষয়টি প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম হিসেবে তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

অন্যদিকে অভিযোগটি সঠিক নয় হলে সংশ্লিষ্ট নথি ও হিসাবের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে অভিযোগের পাশাপাশি প্রবীর কুমার গোস্বামী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এখন পর্যন্ত পুনঃলিগ্যাল নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে প্রবীর কুমার গোস্বামী কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থানও স্পষ্ট হবে।

সব মিলিয়ে, বাঁধ মেরামতের বরাদ্দ অর্থ দিয়ে ম্যুরাল নির্মাণের অভিযোগের সত্যতা, অর্থের পরিমাণ, অনুমোদনের বৈধতা এবং এর কারণে কোনো প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ই এখন মূল প্রশ্ন। ১৫ দিনের মধ্যে নোটিশের জবাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *