ছেলের দায়িত্বের এলাকায় বাবার ৭ সরকারি কাজ, পাউবোর শুভ আহম্মেদকে ঘিরে অনুসন্ধানে দুদক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদের বিরুদ্ধে তাঁর বাবার ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি কাজ নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, শুভ আহম্মেদ নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বাবা মামুনুর রশীদের নামে থাকা ঠিকাদারি লাইসেন্সের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কাজ নেওয়া হয়েছে। নথিপত্রের প্রাথমিক পর্যালোচনায় এমন অন্তত সাতটি কাজের তথ্য পেয়েছে দুদক, যার বিপরীতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্যও সামনে এসেছে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিন সদস্যের ওই দল রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সেচ প্রকল্পে যায়। সেখানে প্রকল্পের কাজ কতটুকু হয়েছে, বাস্তবে কী ধরনের কাজ করা হয়েছে এবং নথিতে দেখানো কাজের সঙ্গে মাঠের কাজের মিল রয়েছে কি না, তা দেখার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলেন কর্মকর্তারা।

দুদকের নারায়ণগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসিফ আল মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনায় তিন সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম দাউদপুরের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহের জন্য দুদকের কর্মকর্তারা ঢাকার মতিঝিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়েও যান।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদের বাবা মামুনুর রশীদের নামে ওই এলাকায় অন্তত সাতটি কাজ হয়েছে। এসব কাজের বিপরীতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের তথ্য নথিতে পাওয়া গেছে বলে জানান দুদকের সহকারী পরিচালক আসিফ আল মাহমুদ।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যে এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন, একই এলাকায় তাঁর বাবার নামে ঠিকাদারি কাজ চলার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকারি কাজের অনুমোদন, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতি যাচাই, বিল অনুমোদন কিংবা প্রকল্প তদারকির ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলীর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দুদকের অনুসন্ধানে শুধু ঠিকাদারি লাইসেন্সের মালিকানা বা কাজ পাওয়ার বিষয়টি নয়, পুরো প্রক্রিয়াটিই যাচাই করা হচ্ছে। সাতটি কাজের দরপত্র কীভাবে হয়েছে, মামুনুর রশীদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট কাজে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না, কারা দরপত্র মূল্যায়ন করেছে এবং কোন কর্মকর্তার সুপারিশে কাজগুলো অনুমোদন হয়েছে—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কাজ পাওয়ার পর বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত টাকা বিল দেওয়া হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, কার্যাদেশ, কাজের অনুমোদন, প্রকল্পের নকশা ও বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে এসব নথির মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দুদকের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে কাজের গুণগত মানও দেখছেন। কোনো কাজ কাগজে সম্পন্ন দেখিয়ে বাস্তবে কম করা হয়েছে কি না, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে কি না কিংবা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের বিপরীতে যথাযথ কাজ হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

এ ছাড়া ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার সময় নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদের কোনো ধরনের অনুমোদন, সুপারিশ বা তদারকির ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁর নিকটাত্মীয়ের মধ্যে একই প্রকল্প বা দায়িত্বাধীন এলাকার ঠিকাদারি সম্পর্ক থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয় কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নথিপত্র অনুযায়ী, শুভ আহম্মেদ বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রূপগঞ্জ এলাকার সেচ, পানি নিষ্কাশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজেও তাঁর দায়িত্ব রয়েছে।

এর আগে রূপগঞ্জের অগ্রণী সেচ প্রকল্পের পানি নিষ্কাশন খাল দখলের অভিযোগের ঘটনায় ২০২৫ সালে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়ার কার্যক্রমেও শুভ আহম্মেদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ২০২৬ সালের জুনে রূপগঞ্জের বরপা এলাকায় অবৈধ দখলে থাকা খাল উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানের সময়ও তাঁর তত্ত্বাবধানের বিষয়টি নথিতে উল্লেখ করা হয়।

এখন সেই রূপগঞ্জ এলাকাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্পে তাঁর বাবা মামুনুর রশীদের নামে সাতটি কাজ পাওয়ার তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বাধীন এলাকায় তাঁর বাবার নামে একাধিক সরকারি কাজ কীভাবে এসেছে এবং সেসব কাজের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর ভূমিকা কী ছিল—এগুলোই এখন দুদকের অনুসন্ধানের মূল বিষয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের প্রয়োজনে প্রকল্পগুলোর নথিপত্র আরও যাচাই করা হবে। কোন সময়ে কাজগুলোর দরপত্র হয়েছে, তখন শুভ আহম্মেদ কোথায় কর্মরত ছিলেন, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন ও বিল ছাড়ের সময় তাঁর দায়িত্ব কী ছিল এবং তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজগুলো পেয়েছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।

এ ছাড়া প্রায় ৪০ লাখ টাকা উত্তোলনের বিষয়টিও আলাদাভাবে যাচাই করা হবে। উত্তোলিত অর্থের বিপরীতে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, বিলের পরিমাণ কাজের বাস্তব পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং কোনো অতিরিক্ত অর্থ ছাড় হয়েছে কি না, সেসব বিষয় নথি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে দুদক।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্য হিসেবে পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা, উপসহকারী পরিচালক জাকির হোসেন ও মুস্তাফিজুর রহমান। তারা প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।

তবে এখন পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে শুভ আহম্মেদ বা তাঁর বাবা মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও নথি সংগ্রহ মূলত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের অংশ।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদ ও তাঁর বাবা মামুনুর রশীদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থানও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন হবে।

এখন দুদকের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র। সাতটি কাজ কীভাবে পাওয়া হয়েছিল, সরকারি কর্মকর্তা শুভ আহম্মেদের কোনো প্রভাব বা সম্পৃক্ততা ছিল কি না, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা নিয়ম মেনে উত্তোলন করা হয়েছে কি না—নথি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ের পর এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *