জমি-ফ্ল্যাট থেকে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ—ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি জাহেদ কামালকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল স্থাবর সম্পদ, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের একক ও যৌথ মালিকানায় একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস ও তাঁর সরকারি আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দাপ্তরিক নথির বরাতে জানা গেছে, বসুন্ধরা-সংলগ্ন জোয়ার সাহারা, ডুমনি, পূর্বাচল ও রূপগঞ্জ এলাকায় জাহেদ কামাল ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের নামে একাধিক স্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে জোয়ার সাহারায় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সম্পাদিত ৯৬৮০ নম্বর দলিলের আওতায় ০.৪৯০১ একর জমির ওপর ১১০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও পার্কিংয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ডুমনি মৌজায় ৬/১৯ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক এবং ১৪৩০/১৯ নম্বর জোতে আরও ৪.৯৫ শতক জমির যৌথ মালিকানার তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পূর্বাচলের কুতুবপুর মৌজায় ৪৫৮৬ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক জমির একটি প্লট এবং রূপগঞ্জের নাওড়া মৌজায় ৯৯৭৬ নম্বর জোতে ৮.২৬ শতক জমির তথ্যও নথিতে রয়েছে।

সম্পদের এই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, একজন সামরিক কর্মকর্তার সরকারি বেতন-ভাতা, বৈধ আয়, ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস জানতে আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

জাহেদ কামালকে ঘিরে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ফায়ার সার্ভিসের একটি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল এবং তৎকালীন ডিজি জাহেদ কামালের অপসারণ দাবি করেছিলেন। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, নিয়োগ নিশ্চিত করতে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছিল এবং একটি সিন্ডিকেট এতে জড়িত ছিল।

২০২৬ সালের জুলাইতেও ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। সে সময় জাহেদ কামাল বলেছিলেন, নিয়োগের বিভিন্ন ধাপে সিসি ক্যামেরা, ড্রোন ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে ফায়ার সার্ভিসের বদলি, পদায়ন, কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করত এবং জাহেদ কামালের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এতে ভূমিকা রাখতেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে বদলি বাণিজ্য, শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিভিন্ন সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ও রয়েছে।

২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান চালিয়েছিল। অভিযানের সময় বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহের কথাও বলা হয়েছিল।

এদিকে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের পদে পরিবর্তন আনা হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদকে নতুন ডিজি করা হয়েছে এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *