ক্যাশিয়ার পদে দুই দশক, গ্রামে প্রাসাদ-শহরে ফ্ল্যাট: জাহাঙ্গীরের সম্পদ নিয়ে নানা প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। পদটি উচ্চমান হিসাব সহকারী, গ্রেড ১৪। প্রায় দুই দশকের চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা থেকে অর্জিত বৈধ আয়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের হিসাব মিলাতে গিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের ক্যাশিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার সুযোগে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় ও বিভিন্ন কাজে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অনুসন্ধানে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী এলাকায় তার প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের একটি চারতলা বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। ফরিদপুর শহরেও রয়েছে একটি অভিজাত ফ্ল্যাট। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন এলাকায় জমি রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। একজন সরকারি কর্মচারীর ঘোষিত বা বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য কতটা, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
বিল ছাড়ে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কাজের বিল ছাড় করাতে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। তাদের দাবি, বিলের পরিমাণের ওপর প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। শুধু বিল পরিশোধ নয়, প্রাক্কলন প্রস্তুত, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন কিংবা নতুন লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে বিভাগটির আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর আলম।
কামারখালীতে কোটি টাকার বাড়ি
সরেজমিনে দেখা যায়, মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি চারতলা বাড়ি রয়েছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির নির্মাণ ও জমির বর্তমান বাজারমূল্যসহ মোট মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা হতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ওই এলাকায় জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রীর নামে একাধিক জমিও রয়েছে। তবে তাদের নামে মোট কত জমি রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তথ্য জানতে চাওয়া হলেও জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
২০ বছরের আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে?
সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় জাহাঙ্গীর আলমের মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। ওই বেতন ধরে ২০ বছরের হিসাবে মূল বেতন থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। অবশ্য চাকরিজীবনে পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে।
তারপরও বর্তমানে দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণের সঙ্গে দীর্ঘ চাকরিজীবনের বেতন-ভাতার হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গ্রামে কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, শহরে ফ্ল্যাট এবং জমিজমার মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ফরিদপুর শহরেও রয়েছে ফ্ল্যাট
গ্রামের সম্পদের পাশাপাশি ফরিদপুর শহরেও জাহাঙ্গীর আলমের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন ১০ তলা ভবন ‘বর্ণমালা’র ৪ নম্বর ভবনের চারতলায় ৫-এর ‘সি’ ইউনিটে ওই ফ্ল্যাটটি অবস্থিত। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
ভবনের নিরাপত্তাকর্মী কুদ্দুস শেখ জানান, জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
সম্পদের উৎস সম্পর্কে জাহাঙ্গীরের ব্যাখ্যা
অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ, কমিশন আদায় ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, তার নামে থাকা সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে।
বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এ ছাড়া বড় বোনের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা, স্ত্রীর নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৮ লাখ টাকা ঋণ এবং নিজের প্রায় ১০ লাখ টাকার সঞ্চয় ব্যবহার করেছেন বলে দাবি করেন।
তবে এসব ঋণ ও অর্থের উৎসের সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।
সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার অনুরোধও করেন জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ না করার প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্য
কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী ইরান হোসেন বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের বাবা ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। তবে তার জানা মতে, বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ এত বেশি ছিল না যে তা থেকে জাহাঙ্গীর আলমের বর্তমান সম্পদের মতো বড় সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে বর্তমানে এলাকায় থাকা সম্পত্তিগুলোর সবগুলো জাহাঙ্গীর আলমের নিজের নামে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য তার কাছে নেই বলেও জানান চেয়ারম্যান।
নির্বাহী প্রকৌশলী জানেন না সম্পদের উৎস
অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তার জানা মতে সঠিক নয়।
তবে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কত এবং এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে—এ বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
ফলে সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন একই পদে থাকা একজন কর্মচারীর দৃশ্যমান বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের বৈধ উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
