৭৫ লাখ টাকা জরিমানার পর কর্মকর্তার বদলি, কমলাপুর কাস্টমসে শিট খালাস ঘিরে নানা প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে শিট আমদানির চালান খালাসকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন ও কাস্টমসের উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমি। অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা পণ্য খালাস, শুল্ক ফাঁকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিতে গেলে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে কমলাপুর কাস্টম হাউসে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন মঈনুল হোসেন। কোনো ক্যাডার কর্মকর্তা সেখানে নতুন করে দায়িত্ব নিলে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন তিনি। এরপর ওই কর্মকর্তার মাধ্যমে নিজের চালানগুলো সহজে খালাসের ব্যবস্থা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে, কোনো কর্মকর্তা মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া চালান আটকে দিলে বা পণ্য পরীক্ষা করতে চাইলে তাকে অন্যত্র বদলি করার জন্য চাপ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

মঈনুলের সঙ্গে খাদিজা পারভীন সুমির ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সুমি যখন কমলাপুর কাস্টম হাউসের আনস্টাফিং শাখার দায়িত্বে ছিলেন, তখন মঈনুলের আমদানি করা শিটের চালান খুব একটা যাচাই করা হয়নি। তিনি যে ধরনের পণ্যের ঘোষণা দিতেন, অনেক ক্ষেত্রেই সেই ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য খালাস হয়ে যেত বলে অভিযোগ। আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে প্রায় ১১ মাস থাকার সময় মঈনুলের কোনো চালান খুলে পরীক্ষা করা হয়নি এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

মঈনুল মূলত দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে। এর একটি পারভীন ট্রেডার্স এবং অন্যটি মা অ্যাসোসিয়েট। এর মধ্যে পারভীন ট্রেডার্সের নামে বিপুল পরিমাণ শিটের চালান খালাস হয়েছে। নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রায় ১১ মাসে পারভীন ট্রেডার্সের প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাস হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল কম শুল্কের এইচআর শিট।

শিটের ধরনভেদে সরকারের শুল্ক আদায়ের পরিমাণেও বড় পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন সিআর শিটে প্রায় ২৮ হাজার টাকা, এইচআর শিটে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা এবং জিপি শিটে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা শুল্ক প্রযোজ্য। অভিযোগ হচ্ছে, বেশি শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের শিট হিসেবে ঘোষণা করে সরকারের রাজস্ব কমিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি প্রায় ২৫ শতাংশ কাস্টম ডিউটি শিট গোপন রেখে বা সঠিকভাবে ঘোষণা না করেই খালাসের অভিযোগও রয়েছে।

শিটের চালানে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ ওঠার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি থেকে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে প্রতি কনটেইনারে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু ওই চিঠির পরও খাদিজা পারভীন সুমি আরও প্রায় এক মাস আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে আনস্টাফিং বিভাগে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের পর। প্রায় দুই মাস আগে খাদিজা পারভীন সুমিকে সরিয়ে ৪০ ব্যাচের সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শিটের চালানের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের মিল আছে কি না, তা যাচাইয়ে গুরুত্ব দেন। এতে মঈনুলের পারভীন ট্রেডার্সের বেশ কিছু চালানে বেশি শুল্কের পণ্য শনাক্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নতুন কর্মকর্তার সময়ে পারভীন ট্রেডার্সের কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিট খালাস হয় ২ হাজার ২৩৩ টন। বিপরীতে বেশি শুল্কের জিপি শিট খালাস হয় ১০ হাজার ১৬২ টন। এ সময় মঈনুলের সাতটি চালান মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তী যাচাইয়ে মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে এসব চালানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

মামলার আওতায় থাকা সাতটি বিল অব এন্ট্রির নম্বর হলো সি-১১৫৫৫, সি-১১৫৪৮, সি-১১৫৫২, সি-১১৫৫৭, সি-১১৫৪৭, সি-১১৫৫৩ এবং সি-১১৫৫৪। এসব চালানে মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

এ ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে, একই ধরনের চালান আগে কীভাবে সহজে খালাস হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগ রয়েছে, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় বেশি শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এ সময় প্রায় ৯০ শতাংশ চালান কম শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। কিন্তু সুমিকে সরিয়ে আসিফ আহমেদ অনিক দায়িত্ব নেওয়ার পর চিত্রটি বদলে যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ চালান বেশি শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হতে থাকে।

এতে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ার পাশাপাশি আগের সময়ের শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও নতুন করে সামনে আসে। এরই মধ্যে মঈনুলের কয়েকটি চালান আটকে মামলা হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলা করার এক সপ্তাহের মধ্যেই সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে সরাতে মঈনুলের পক্ষে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এরপর আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে ৪১ ব্যাচের কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মঈনুলের মা অ্যাসোসিয়েটের গাড়ির গ্রুপ দেখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। এতে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে, অনিয়ম বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপের পর আবারও আগের প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে কি না।

কমলাপুর কাস্টম হাউসে কর্মকর্তা বদলির অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। শিটের চালান নিয়ে হস্তক্ষেপ করায় সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করার অভিযোগও রয়েছে। এর আগে এক কমিশনার বদলি হওয়ার পর সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৮২০ টন শিট মিথ্যা ঘোষণায় খালাসের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ওই ঘটনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মঈনুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত শুরু হয় বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মঈনুল দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। কর্মকর্তাদের গাড়ি ভাড়ার খরচ বহনসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। এভাবেই মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া পণ্য দ্রুত খালাস এবং শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি করা হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

মঈনুলের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে সিআইসি থেকে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে। শিটের চালান নিয়ে একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, কাস্টম হাউসে মঈনুলের দীর্ঘদিনের প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

খাদিজা পারভীন সুমির দায়িত্ব পালনের সময় নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি সাধারণত বিকেলের আগেই অফিস ত্যাগ করতেন। এরপর সন্ধ্যার পর মঈনুলের বেশ কিছু চালান কাস্টম হাউস থেকে বের হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় তার হয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলম কাজ করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই চালান খালাসের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

অন্যদিকে, কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। অনিয়মের চেষ্টা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কাস্টম হাউসের কার্যক্রমে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

খাদিজা পারভীন সুমিকে আনস্টাফিং থেকে সরানো হলেও তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমানে শিটের অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপের দায়িত্বের সঙ্গে তিনি যুক্ত রয়েছেন। তার স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তা বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। অতীতে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে লালবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খাদিজা পারভীন সুমি। তার দাবি, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকাকালে কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি হয়নি। তিনি দায়িত্ব পালনকালে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে জানান। তিনি আরও বলেন, সাধারণত বিকেল ৫টার মধ্যেই তিনি অফিস ত্যাগ করতেন।

সন্ধ্যার পর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলমের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমি বলেন, উপকমিশনার হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডের ব্যক্তিগত দায় তিনি নিতে পারেন না।

অন্যদিকে মঈনুল হোসেনও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, দীর্ঘদিন একই খাতে কাজ করার কারণে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি দেননি বলে দাবি করেন। সাম্প্রতিক মামলার বিষয়ে তার বক্তব্য, কাস্টমসে অনেক ব্যবসায়ীর নামেই মামলা হয়। আর সুমির দায়িত্বের সময় শুধু সিআর ও এইচআর শিট আমদানি করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

সব মিলিয়ে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিটের চালান খালাস, পণ্যের সঠিক ঘোষণা, শুল্ক নির্ধারণ এবং কর্মকর্তা বদলি নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। একদিকে কয়েকটি চালানে মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে মামলা ও জরিমানার ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে আগে খালাস হওয়া বিপুল পরিমাণ চালান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, চালান, বিল অব এন্ট্রি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *