ঠিকাদারদের অভিযোগে আলোচনায় মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ঠিকাদার, বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি এবং একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন প্রকল্পে কার্যাদেশ প্রদান, কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত, অনুমোদন এবং চেক ছাড়ের মতো ধাপগুলোতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন দাবি করা হয়। তাদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী সরাসরি অর্থ গ্রহণ না করলেও অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমিশন আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিল দ্রুত ছাড় করাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। যদিও এসব অভিযোগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং কিছু ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই ধরনের অনিয়ম বর্তমান সময়েও অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাসপাতাল-২, ইন্টার্নি ছাত্র হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার, জরুরি বিভাগ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, বহির্বিভাগ (ওপিডি), পানি সরবরাহ ও স্যুয়ারেজ লাইনের সংস্কারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হলেও কয়েকটি প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান যথাযথভাবে তদারকি করা হয়নি। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ছাদের পলেস্তারা খসে রোগী আহত হওয়ার ঘটনাও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল কোটেশন প্রক্রিয়াতেও সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের কিছু ফিনিশিং কাজ এবং বিল পরিশোধ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সের দাবি, অগ্রিম বিল ছাড়ের পর অতিরিক্ত কমিশন দাবি করা হয়েছে।

কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় নির্বাহী প্রকৌশলীকে অফিসে পাওয়া যায় না। তবে নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে সহযোগিতা দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কমিশন না দিলে বিল, ফাইল বা অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিলম্ব করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, টেন্ডার, বিল বা প্রকল্প-সংক্রান্ত কোনো পর্যায়ে তিনি আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন না। তাঁর নাম ব্যবহার করে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কমিশন আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও অভিযোগগুলোর তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পরও দীর্ঘ সময় নীরবতা বজায় থাকায় প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থ ব্যয়, কাজের মান এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। তাদের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো প্রয়োজন। তাদের ভাষায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়াই সবচেয়ে জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *