৬৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু‑সহনশীল প্রকল্পে পিডি মো. এনামুল কবিরকে ঘিরে জমেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর অর্থ লোপাটের অভিযোগ।

বিশেষ প্রতিবেদকঃ এই মুহূর্তে আলোচনায় রয়েছে ৬,৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু সহনীয়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক (পিডি) মো. এনামুল কবির দীর্ঘ সময় ধরেই ব্যক্তিগতভাবেই এই প্রকল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। প্রায় ৫০০ জন আউটসোর্সিং কর্মী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ, বিলাসবহুল অফিস, ভুয়া বিল — সবকিছু মিলিয়ে এই প্রকল্প এক ধরনের “ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য”তে পরিণত হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগের জন্য যারা নেয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই এনামুল কবিরের আত্মীয়-স্বজন বা ঘনিষ্ঠ। প্রতিটি পদে নিয়োগের সময় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া গেছে। একাধিক স্বজন–নিয়োগ, প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পাওয়ার ঘটনা, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে — প্রশ্ন, এই টাকা কোথা থেকে এল?

অধিক উদ্বেগজনক হলো — অফিসের দৃষ্টিকোণ থেকে। অফিসকে সাজানো হয়েছে রাজকীয় স্টাইলে; বিলাসবহুল ফার্নিচার, প্রিপেইড বিল, ডেকোরেশনের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনো নথি জনসমক্ষে দেখা যায় না। বিল দেখানোর প্রয়োজন হলে ভুয়া বিল বা ভাউচার দেখানো হয় বলে অভিযোগ।

এলজিইডির নিজস্ব বড় ভবন থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে — সেটাও প্রশ্নের মুখে। ভাড়া নেওয়া হয়েছে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায়, আগোরা ভবনে, যা “কমার্শিয়াল স্পেস” হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু অফিস ভাড়া ও পরিচালনার জন্য কেন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সব সাজানো হয়েছে — তারও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এনামুল বা সংশ্লিষ্ট কেউ।

তবে অভিযোগ শুধু অর্থ লোপাট এবং স্বজন চিনে চাকরি দানে সীমাবদ্ধ নয়। বলা হচ্ছে, এনামুল কবিরের বড় ভাইয়ের নামে করা হয়েছে অর্থ লেনদেন। দুই ভাই মিলে কিনেছেন শত শত বিঘা জমি; গ্রামের বাড়ি থেকে শুরু করে নতুন করে তৈরি হয়েছে রাজকীয় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। এমন ভাবা হচ্ছে, স্বাভাবিক বেতনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সম্পদ গড়েছেন তারা — কিন্তু তার উৎস কি?

অফিজিয়াল অভিযোগ হলো, অফিস পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছে পিএল এমন এক ব্যক্তি, ফরিদ — যিনি প্রকল্প বা সরকারের কোনো অফিসার নন। তারপরও অফিস ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, রক্ষণাবেক্ষণ — সব দায়িত্ব তার হাতে। সন্ধ্যার পর অফিসে অতিথি, রাতভর আড্ডা; পৃথক একটি কক্ষ রয়েছে তার জন্য। এমনকি বেশ কিছু দিন হয়, সমাজের সচেতন মানুষ বা সাংবাদিকরা চেষ্টা করে অফিসে যাওয়ার — কিন্তু হয় না। অফিসে আছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ফটক, এবং প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় শুধুই এনামুল কবিরের অনুমতিতে। নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ এমন — “মাস্তানসুলভ” — যে, কোনো সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষ সেখানে যাওয়ার সাহস পান না। অনেকেই বলছেন, প্রকল্প অফিসে ঢুকতে পারা এমন যেন কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিব বা মন্ত্রীর অফিসে ঢোকার সমান ঝামেলার।

এই অভিযোগগুলো শুধু গঞ্জন নয়। ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে, মোহাম্মদ শামীম বেপারী স্বাক্ষরিত চিঠি (নং ৪৬.০০.০০০০.০৬৮.৯৯.০৭১.২৪‑১০৮৭) জারির মাধ্যমে ৩ দিনের মধ্যে তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই নিয়ে শুধু সাম্প্রতিক নয় — আগেও এনামুল কবিরকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যখন তিনি পূর্বে সিলেটে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন, সেসময়েও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে LGED‑র প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান‑র অধীনে স্টাফ অফিসার ছিলেন এনামুল — তৎকালীন সময়েও ভুয়া বিল এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকত।

কিন্তু ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই জলবায়ু‑প্রকল্পে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমূল বদলে গেছে পরিস্থিতি। প্রকল্পকে বলা হচ্ছে এখন পিডির ‘ব্যক্তিগত দলে’ পরিণত — নিয়োগ, অর্থের লেনদেন, অফিস পরিচালনা, আর অফিসের হালচাল সবকিছু তার নিজের নিয়ন্ত্রণে।

সংবাদচেষ্টায় গিয়ে যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এনামুল কবিরকে পাওয়া যায়নি। বরং, তিনি সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন — “আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই”। এবং দেওয়া হয়েছে — “দেখে নেওয়ার” হুমকি। এমন আচরণ সামাজিকভাবে আবারও প্রমাণ করলো — শুধু অনিয়ম নয়, ভয়ভীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁর সাধারণ হাতিয়ার।

এখন প্রশ্ন হলো — একজন সাধারণ ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর ঘর থেকে উঠে আসা মানুষ কীভাবে গড়েছেন এমন বিশাল সম্পদ? কীভাবে নিয়োগ দিয়েছেন স্বজনকে, নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা ঘুষ, সাজিয়েছেন বিলাসবহুল অফিস, নিয়েছেন হেলিকপ্টারে যাতায়াত, এবং গড়েছেন নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য?

সরকার ইতোমধ্যেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, এবং অফিস ডেকোরেশন, জনবল নিয়োগসহ অন্যmany অনিয়মের বিষয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেলে, বিষয়টি হয়তো আদালত বা তদন্ত কমিটিতে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে, প্রকল্পের সঠিক হিসাব, নিয়োগ‑ভেন্ডরদের তালিকা, বিল ও ভাউচার — এগুলো জনসমক্ষে না আসা পর্যন্ত, অনেক প্রশ্নই থেকে যাবে। আর গ্রামের সেই সাধারণ একজন ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর সন্তান থেকে “নতুন জমিদার” হওয়া — এ ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, আর দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *