২২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে অর্থ আদায়, নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি সরাসরি অর্থ গ্রহণ না করলেও অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমিশন আদায়ের একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত, অনুমোদন ও চেক গ্রহণ—প্রায় প্রতিটি ধাপেই ঠিকাদারদের নির্ধারিত হারে অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ।

দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগের দুই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) কাজের বিনিময়ে কমিশনের কথা বলেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিল সময়মতো পেতে হলে আগে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিমূল্যের ৫৭ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই অর্থের একটি অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও পৌঁছায়। তবে মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আবাসিক, অনাবাসিক, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে প্রায় ২২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রকল্পের একটি অংশে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি এবং একই ধরনের অনিয়ম চলমান অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাসপাতাল-২, ইন্টার্নি ছাত্র হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার, জরুরি বিভাগ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ওপিডি ভবন, পানি সরবরাহ ও স্যুয়ারেজ লাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর সংস্কারকাজে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের ৩০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে এক রোগী আহত হওয়ার ঘটনাও রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ম্যানুয়াল কোটেশনের মাধ্যমেও সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের কিছু ফিনিশিং কাজেও অনিয়ম এবং অগ্রিম বিল পরিশোধের পর অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সরা।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় নির্বাহী প্রকৌশলীকে অফিসে পাওয়া যায় না। তবে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে তিনি নিয়মিত বৈঠক করেন এবং তাদের বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা দেন। কমিশন না দিলে বিল, ফাইল ও প্রশাসনিক কাজ বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, টেন্ডার বা বিল প্রক্রিয়ায় তিনি কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন না। তবে তাঁর নাম ব্যবহার করে এসডিইদের কমিশন আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য আর পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ, কাজের মান এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *