সরকারি কর্মকর্তা নাকি বিতর্কিত ক্ষমতার খেলোয়াড়? আলোচনায় প্রকৌশলী কামরুল হাছান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছানকে ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন, ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, তার কর্মজীবনের গল্প শুধু প্রশাসনিক কাজের নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব এবং বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে তৈরি এক জটিল অধ্যায়।

কামরুল হাছান, যিনি অনেক জায়গায় “কামরুপ” নামেও পরিচিত, কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গৌরিপুরের কড়িকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৫০ বছর। পারিবারিক দিক থেকেও তিনি প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্য। তার স্ত্রী ডা. জান্নাতুল মাওয়া টুম্পা পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে গাইনী বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত এবং একই সঙ্গে ‘কেয়ার ফাস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ রোগী দেখেন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে—কন্যা আদিবাতুন নাবিহা এবং পুত্র আব্দুল্লাহ আল নাবহান। কামরুলের ছোট ভাই ডা. মুক্তার হোসেন নাসের ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত এবং তার স্ত্রী ডা. টুম্পা শিকদারও মেডিকেল কলেজে চাকরি করেন। পরিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার কর্মজীবনের নানা ঘটনা তাকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছান, যিনি অনেক জায়গায় “কামরুপ” নামেও পরিচিত, তাকে ঘিরে নানা সময় নানা বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও কৌশল ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও তাকে অনেকেই অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে দীর্ঘ সময় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। অনেকের মতে, সে সময় তার প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও তার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিতেন।

২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী একটি প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ মহলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে প্রভাব খাটান। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা আরও দৃঢ় করেন বলে সমালোচকদের দাবি।

পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগের কারণে তাকে নোয়াখালী থেকে বরিশালে বদলি করা হলে সেখানেও তিনি নতুন করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার আত্মীয় হিসেবে পরিচিত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার সমন্বয়ের কথাও অনেকের মুখে শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দরপত্র প্রক্রিয়ায় নিয়মিত পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হতো। এলটিএম (LTM) পদ্ধতির বদলে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করে কমিশনভিত্তিক একটি বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বড় বড় সরকারি কাজ বণ্টন করা হতো এবং এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়েছে। বরিশালের মেডিকেল সাবডিভিশনের কিছু প্রকল্প নিয়েও তখন নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তবে এত আলোচনা ও অভিযোগ সত্ত্বেও প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় কোনো বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হননি বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।

আরেকটি আলোচিত অভিযোগ ছিল নিজের ব্যাচমেট প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি জাল ডিও (ডেমি অফিসিয়াল) লেটার তৈরির পরিকল্পনা। বলা হয়, প্রভাবশালী নেতার নাম ব্যবহার করে একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, যাতে আন্দালিবকে বদলি করা যায় এবং নোয়াখালীতে আবারও নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।

এই সময়টাতে তার বিরুদ্ধে একদিকে প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্ক সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। স্থানীয় কিছু ঠিকাদার তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি কাজ বণ্টনের অভিযোগ ওঠে। ভাঙারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মামুন, যার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স আব্দুল ছাত্তার আহাদ, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়া বা একক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়েছে।

একাধিক ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক কাজ একই ঠিকাদারের কাছে দেওয়া হয়। আবার ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২২টি কার্যাদেশ জারি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকেই মনে করেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়নি।

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও তার বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, দরপত্র জমা দেওয়ার ঠিক আগে প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার সুবিধা পায়। একইভাবে হাতিয়া মডেল মসজিদ প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতি কম হলেও তুলনামূলক বেশি বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক বিষয়ই নয়, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক নারী কেলেঙ্কারি, পরকীয়া এবং অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। পটুয়াখালীতে কর্মরত থাকার সময় এক অধস্তন কর্মকর্তার স্ত্রী ঝুমুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ আছে, ওই কর্মকর্তা অন্য কাজে বাইরে গেলে কামরুল নিয়মিত তার বাসায় যাতায়াত করতেন। এমনকি যাতায়াত গোপন রাখার জন্য বাসার পেছনের দেয়ালে আলাদা দরজা তৈরি করা হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি একসময় প্রতিবেশীদের নজরে এলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ঘটনাটি নিয়ে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। পরে ওই দম্পতির সংসার ভেঙে যায় বলে জানা যায়।

আরেক ঘটনায় বলা হয়, নোয়াখালীর মাইজদী এলাকায় এক কিশোরীকে নিয়ে বিতর্কিত একটি ঘটনায় স্থানীয় মানুষের হাতে তিনি মারধরের শিকার হন। অভিযোগ ওঠে, ওই কিশোরীর সঙ্গে তার আপত্তিকর সম্পর্কের ঘটনা সামনে আসার পর এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ঘিরে ফেলে। পরে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে তথাকথিত “মুতা বিয়ে” নামে সাময়িক সম্পর্কের অভিযোগও বহুবার আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপন করতেন এবং এটিকে অনেক সময় বিয়ের নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। তবে ইসলামী শরীয়াহ ও বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের বিয়ের কোনো স্বীকৃতি নেই বলে ধর্মীয় ও আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।

তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের তালিকায় আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পর্যায়ে তার সম্বন্ধীর স্ত্রী ফিরোজার সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ সামনে আসে। ফিরোজা পেশায় একজন নার্স এবং তার স্বামী একজন চিকিৎসক। এ ঘটনাও পরিবারিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান বলে অনেকের দাবি। বরিশালে বদলি হওয়ার পরও তিনি নতুন একটি টেন্ডার সিন্ডিকেট তৈরি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও আলোচনায় আসে।

আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা হলো নিজের ব্যাচমেট প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে সরাতে একটি জাল ডিও লেটার তৈরি করার অভিযোগ। বলা হয়, তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম ব্যবহার করে একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করেন এবং সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠান, যাতে আন্দালিবকে বদলি করা হয়। পরে এই ঘটনাটি প্রশাসনিক মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব অভিযোগ, বিতর্ক এবং অনিয়মের কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে নোয়াখালী থেকে সরিয়ে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হয়। তবে বিভিন্ন মহলে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও কীভাবে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এই ঘটনাগুলো প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, এমন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সত্য ঘটনা সামনে আসে এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *