প্রযুক্তিগত নির্ভরতা ইউক্রেনে যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নজরদারি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি সরঞ্জাম সব ক্ষেত্রেই বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটির নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইউক্রেনের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা আলেকজান্ডার কারদাকভ দাবি করেছেন, দেশটির ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নজরদারি ক্যামেরা চীনা প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে।

তার মতে, এই ঝুঁকি কেবল সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা গোয়েন্দা ড্রোনের ক্যামেরাতেও বিস্তৃত, যা চলমান যুদ্ধে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি রুশ বাহিনীর মাধ্যমে ইউক্রেনীয় ড্রোন নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের অভিযোগও সামনে এসেছে।

এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হিকভিশন–এর নাম। রাজধানী কিয়েভ এর ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পে এই কোম্পানির ক্যামেরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরজুড়ে প্রায় সাত হাজার স্মার্ট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, যা যানবাহনের নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, মুখমণ্ডল চেনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এসব প্রযুক্তিতে কোনো গোপন প্রবেশপথ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে, তবে তা রাজধানীর জনজীবন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্য বহিরাগতদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। শুধু কিয়েভ নয়, পুরো ইউক্রেনেই এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন এই ধরনের কিছু চীনা প্রযুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যুক্তরাজ্যেও সংবেদনশীল স্থাপনায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে ইউক্রেনে এ ধরনের সুস্পষ্ট নীতিগত ব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা কেবল নজরদারি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল অপারেটরদের বেস স্টেশনে ব্যবহৃত অধিকাংশ ব্যাটারি চীনা এবং অনেক ক্ষেত্রেই দূরনিয়ন্ত্রিত। তাত্ত্বিকভাবে এসব ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ সম্ভব হলে বিদ্যুৎ সংকটের সময় পুরো শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে।

একইভাবে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর বড় অংশ নির্ভর করছে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে ও জেডটিই এর ওপর। স্মার্টফোন বাজারেও চীনা ব্র্যান্ডগুলোর প্রাধান্য রয়েছে, যা প্রযুক্তিগত নির্ভরতাকে আরও গভীর করেছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ যন্ত্র যেগুলোর বেশিরভাগই চীনে তৈরি সেগুলোর অনেকগুলোই ইন্টারনেট সংযুক্ত। ফলে এগুলোর ওপর সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত কাঠামোতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা, ক্লাউড অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্বিমুখী নির্ভরতা একদিকে চীন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর এর প্রভাব গভীর হতে পারে, অথচ বিকল্প ব্যবস্থা এখনো সীমিত।বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি শুধু উন্নয়নের মাধ্যম নয়, এটি প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। আর সেই বাস্তবতাই আজ ইউক্রেনের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতা রক্ষায় প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা কতটা জরুরি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *