পদোন্নতি, টেন্ডার ও সম্পদ—সওজের আবু হেনা তারেক ইকবালের উত্থান নিয়ে যত অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় তিনি সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সুবিধা নিয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অবস্থানও বদলে এখন নিজেকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সওজে প্রায় ২৭ বছরের কর্মজীবনে আবু হেনা তারেক ইকবাল বিভিন্ন সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে সুবিধা নিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের কর্মকর্তা হিসেবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন তিনি। চাকরির শুরু থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হিসেবে পরিচিত চকরিয়া সড়ক উপবিভাগে তদবির করে পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সে সময় নিজেকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে ঢাকা সড়ক বিভাগের কল্যাণপুর সড়ক উপবিভাগে দায়িত্ব পান তিনি।
তবে ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার কর্মজীবনে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা-আশুলিয়া টোলের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে নিজের পরিচয় আবার পরিবর্তন করেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তখন তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগপন্থী প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করেন।
ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আবু হেনা তারেক ইকবালের প্রভাব আরও বাড়ে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ওই সময় তিনি নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশ্রাতুন্নেসা কাদেরের কাছে বিভিন্ন সময় উপহার ও উপঢৌকন পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। একই সঙ্গে নোয়াখালীর তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা সার্কেলের অধীনে মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও রাজনৈতিক তদবিরের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ, টেন্ডার এবং কমিশন বাণিজ্য নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর কারণে তার ক্যারিয়ারে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
বরং এর পরই তার পদোন্নতির পথ আরও সহজ হয় বলে অভিযোগ। তিনি চট্টগ্রাম সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে বরিশাল সড়ক জোনে যোগ দেন। বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে হাসনাত আবদুল্লাহর পরিবারের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তিনি কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সওজের অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন চাকরি করেও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাননি। কিন্তু আবু হেনা তারেক ইকবাল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন। এমনকি আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তাও তার প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের একটি হলো টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগকারীদের দাবি, তার দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন কর্মস্থলে ঠিকাদারি কাজের টেন্ডার নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় ছিল। ইজিপি পদ্ধতি চালুর পরও পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের কাজ, ঠিকাদার নির্বাচন এবং কমিশন নিয়ে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় আবু হেনা তারেক ইকবাল কিছুদিন নিয়মিত অফিস করেননি। পরে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সামাল দিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে নিজের অতীত কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সরকার পরিবর্তনের পর তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকার পর এখন তিনি নিজেকে বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচিত করছেন। বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর তাকে চট্টগ্রাম সড়ক জোনে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর জন্য তদবির করা হয়েছিল। সাবেক সচিবের পক্ষ থেকেও তার পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কয়েকজন ঠিকাদার ও সওজের বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের আপত্তির কারণে সেই পদায়ন শেষ পর্যন্ত হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শুধু রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পদোন্নতি নয়, তার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীতে তার একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের বড় একটি অংশ আয়কর নথিতে যথাযথভাবে দেখানো হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তার নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ফারজানা রহমান ভূঁইয়া, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ রাখার মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে ১/১২ পার্ক ভিউ ভবনের এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটটির মালিকানা নিয়েও অভিযোগে তথ্য দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা এবং এটি ভাড়া দেওয়া রয়েছে। আবু হেনা তারেক ইকবাল বর্তমানে গুলশানে বসবাস করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হুদার সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে রাজধানীতে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। এমনকি তার নামে একাধিক প্লট বরাদ্দ নেওয়ার বিষয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, বৈধ উৎস এবং বরাদ্দের বিষয়ে সরকারি নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আবু হেনা তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোনে সাড়া দেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আবু হেনা তারেক ইকবালের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি কর্মস্থলের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, প্রকল্পের দায়িত্ব, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সম্পদের হিসাব আলাদাভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, ঠিকাদারি কাজে হস্তক্ষেপ, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থের অনিয়ম এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
আবু হেনা তারেক ইকবাল ২০২৯ সালে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, অবসরের আগে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তিনি সত্যিই রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধা নিয়েছেন কি না, টেন্ডার ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেছেন কি না কিংবা তার সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।
