দুর্নীতির জাল বুনে বহাল তবিয়তে ডিএসসসির উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজাহান আলী!

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ডিসিআরও) মো. শাহজাহান আলী যেন দুর্নীতির আরেক নাম। পলাতক সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাব অটুট রয়েছে। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে আবারও কর পরীবিক্ষণ শাখায় উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অথচ ২০২২ সাল থেকেই তিনি এই পদবি ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক ও অনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসছেন।
মাত্র ৯৫ হাজার ৯৩৫ টাকার মাসিক বেতন থেকে ব্যাংকের কিস্তি, গাড়িচালক ও বাড়ির কেয়ারটেকারের বেতন, এমনকি বাড়ির মেইনটেইন্যান্সের খরচ বহন করাও বাস্তবে অসম্ভব। অথচ শাহজাহান আলীর বিলাসী জীবনযাপন তার আয়-উৎসের বৈধতার প্রশ্ন তোলে। সম্প্রতি বিবাহবার্ষিকীতে স্ত্রী সাবিয়া সুলতানা মলিকে মূল্যবান হীরার নেকলেস ও আংটি উপহার দিয়েছেন তিনি। গত ৯ সেপ্টেম্বর আর্মি গলফ ক্লাবে মেয়ের বিয়েতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেন। রাজধানীর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩ কাঠার প্লট ও সাততলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি তার সম্পদের অংশ। ওই প্লটটি ২০০৮ সালে মাত্র ৯ লাখ ২০ হাজার টাকায় রেজিস্ট্রি করা হলেও বাস্তবে সেখানে প্রতি কাঠার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। বাড়িটির জন্য তিনি বছরে মাত্র ৩৩ হাজার টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স দেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা পদবির প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে অবৈধ কর ছাড় ও আর্থিক সুবিধা আদায় করেছেন। বাটা সু কোম্পানিতে নিজের মেয়ের চাকরির ব্যবস্থাও করেছেন এই প্রভাব ব্যবহার করে। আবার শাহ সিমেন্টের কর প্রদানের চিঠি দেওয়া হলেও, কোম্পানিটির ফাইল এখনও ‘খোলা হয়নি’।
শাহজাহান আলীর ব্যক্তিগত জীবনও বিতর্কে ভরা। ডিএসসিসির অঞ্চল-২ এ কর কর্মকর্তা থাকাকালে রাজস্ব বিভাগের মাস্টার রোলে কর্মরত এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারী গর্ভবতী হলে বিয়ের দাবি জানান, কিন্তু শাহজাহান আলী রাজি হননি। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে ২০১৮ সালের ৬ মে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে পরবর্তীতে মেয়র তাপসের প্রভাবে আরেকটি তদন্তে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় এবং উল্টো ওই নারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এছাড়াও, শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে একাধিক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মেয়র তাপসের যোগসাজশে তিনি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। একাধিক আদালতের স্থগিতাদেশ অগ্রাহ্য করে তাকে দুই দফা পদোন্নতি দেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে দুটি নোটিশ দিয়েছিল, যেখানে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও কর নির্ধারণে অনিয়মের তদন্ত চাওয়া হয়। কিন্তু অদৃশ্য প্রভাবের কারণে সেই তদন্ত আর অগ্রসর হয়নি। ফলে দুর্নীতির অসংখ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শাহজাহান আলী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে তার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
