গণপূর্তে প্রকল্প বণ্টনে সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র দখল: টেন্ডার, কমিশন আর দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট—যারা এখন প্রকল্প বরাদ্দ থেকে শুরু করে টেন্ডার ও বিল পাস পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রতি কোটি টাকার প্রকল্পে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্য চলে, যা দপ্তরের ভেতরেই এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনের অনুমোদন থাকলেও সিন্ডিকেটের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকল্প এগোয় না। এই প্রভাব এতটাই গভীর যে, দপ্তরের নিয়মকানুন কার্যত কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ঢাকার সিএমএম আদালতে দায়ের হওয়া সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ অনুযায়ী, গণপূর্তের ২৫ জনেরও বেশি প্রভাবশালী কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। মামলায় নাম এসেছে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে টেন্ডার কারচুপি, প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রশাসনিক অপব্যবহার।
এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন তৈমুর আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন, এ. এন. মাজাহারুল ইসলাম, মো. মিজানুর রহমান, মোর্শেদ ইকবাল, মো. আবুল খায়ের, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. সোলায়মান হোসেন, আব্দুল হালিম, শরীফ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম, মোসলেহ উদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, মো. মেহেদী হাসান, মো. এনামুল হক এনাম, পবিত্র কুমার দাস, মো. ইউসুফ, আজমল হক মনু, মো. শামসুল ইসলাম, সতীনাথ বসাক, মো. মনিরুজ্জামান, মো. শহিদুল আলম, মো. ইলিয়াছ আহমেদ, মো. ফজলুল হক, উৎপল কুমার দে এবং শেখর চন্দ্র বিশ্বাস।
অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বড় প্রকল্পে চার ধাপে কমিশন বণ্টনের রীতি চালু আছে—উচ্চপর্যায়ে অনুমোদনের আগে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমিশন, মাঠ পর্যায়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও মধ্যস্থদের জন্য ৩ থেকে ৫ শতাংশ, আর অফিস পর্যায়ে বিল রেকর্ড ও নিয়ন্ত্রণ শাখায় ২ থেকে ৩ শতাংশ।
ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ও সিভিল বিভাগই এখন এই কমিশন বাণিজ্যের কেন্দ্র। অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তা এখনো প্রভাব বজায় রেখেছেন, কেউ কেউ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা বা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, “এই সাবেক কর্মকর্তাদের ফোন এলেই অনেক সময় প্রধান প্রকৌশলীর সিদ্ধান্ত বদলে যায়। কারণ, এদের পেছনে রাজনৈতিক ছায়া আছে।”
বর্তমানে সিন্ডিকেট তিন ভাগে বিভক্ত—সিভিল শাখা সিন্ডিকেট বিল ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে, ই/এম সিন্ডিকেট বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকল্পে প্রভাব রাখে, আর প্রশাসনিক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বদলি, পদোন্নতি ও অফিস অর্ডার।
একজন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, “একটি প্রকল্প শুরু থেকে বিল পাস পর্যন্ত অন্তত আটটি ধাপে ঘুষ দিতে হয়। এই চক্র না ভাঙলে কোনো সংস্কারই টিকবে না।”
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে প্রতিদিন বিকেলে ১১ তলার করিডোরে হয় সিন্ডিকেটের অঘোষিত বৈঠক—যাকে কর্মকর্তারা মজা করে বলেন ‘টেবিল কমিটি’। সেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই ঠিক হয় কোটি টাকার ভাগ, কোন ঠিকাদার পাবে কাজ, আর কে বদলি হবে।
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার দপ্তরে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিলেও সিন্ডিকেটের চাপের মুখে তা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি আদেশও সিন্ডিকেটের আপত্তিতে স্থগিত হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক সহায়তা না পেলে মামলা এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তাদের মতে, গণপূর্তের সিন্ডিকেট কেবল সরকারি অর্থ নয়, উন্নয়নের ভাবনাকেও লুট করছে। এখন প্রকল্প মানেই লাভের খেলা—যেখানে জনগণের টাকায় চলছে দুর্নীতির উৎসব। যতদিন এই সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভাঙা না যায়, ততদিন গণপূর্তের প্রকল্প মানে থাকবে দুর্নীতির স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।
