গণপূর্তে দুর্নীতির সাম্রাজ্য: প্রধান প্রকৌশলীর ছত্রচ্ছায়ায় “কায়কোবাদ অ্যান্ড কোং” সিন্ডিকেট

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর—নাম শুনলেই এখন অনেকের চোখে ভেসে ওঠে দুর্নীতি, কমিশন আর সিন্ডিকেটের এক বিশাল সাম্রাজ্য। আর এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ। চুয়েট ছাত্রলীগ ঘরানার এই সাবেক ফ্যাসিস্ট চরিত্র সরকারি পদে থেকেও দুর্নীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ক্ষমতার দম্ভে তিনি এখন সরকারি অফিসকে বানিয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত উপার্জনের ঘাঁটি, আর দুর্নীতির খবর ধামাচাপা দিতে তৈরি করেছেন এক “দালাল সাংবাদিক বাহিনী”।
কায়কোবাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে এক অদ্ভুত দল—কেউ সাংবাদিক, কেউ ঠিকাদার, আবার কেউ একসাথে দুই ভূমিকায়। কেউ তার আত্মীয়, কেউ ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কেউ আবার মনোরঞ্জনের সরবরাহকারী। তারা নিজেদের নামসর্বস্ব পত্রিকার সম্পাদক বা মালিক সাজিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গণপূর্ত ভবনে। “সাপ্তাহিক বগলদাবা”, “অর্ধবার্ষিক দৈনিক” কিংবা “হঠাৎ অনলাইন নিউজ” নামের আজব মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে তারা কায়কোবাদের দুর্নীতিকে সততার গল্পে রূপ দিচ্ছে। কেউ তার পক্ষে বিজ্ঞাপন ছাপে, কেউ আবার দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে সেটিকে “তথ্য সন্ত্রাস” বলে চালিয়ে দেয়। যেন চোরের মুখে রামনাম, আর মিডিয়ার মেকআপে ঢাকা পড়ে যায় সরকারি লুটপাটের বাস্তবতা।
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম চরিত্র কথিত সাংবাদিক মোহন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ৫ আগস্টে তিনি গণপূর্তের কয়েকজন কর্মকর্তাকে “হত্যাকারী বানানোর ভয়” দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। যারা অর্থ দিতে অস্বীকার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মিডিয়া ব্যবসা আর ঠিকাদারি একসাথে চালিয়ে তিনি যেন “দুই হাতে লুটের” জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কায়কোবাদের আরেক বিশ্বস্ত সহযোগী হলেন “মিলেনিয়াম ট্রেডার্স”-এর মালিক আলী আকবর। এই ঠিকাদার কাম দালাল প্রতিটি টেন্ডারে কায়কোবাদের ছায়াসঙ্গী। কমিশন ভাগাভাগি থেকে শুরু করে টেন্ডার সিন্ডিকেট—সবখানেই তার উপস্থিতি। গণপূর্ত ভবনে এখন এমনও বলা হয়—“কায়কোবাদের অনুমতি ছাড়া একটি ইটও নড়ে না।”
তবে কায়কোবাদের এই উত্থান সম্ভব হয়েছে এক উচ্চপদস্থ পৃষ্ঠপোষকের কারণে—প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার। তার বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে। ভিআইপি প্রোগ্রামের নামে কোটি টাকার অর্থ লোপাট, টেন্ডারে অনিয়ম, আত্মীয়স্বজনকে ঠিকাদারি সুবিধা দেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন—সবই তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এমনকি হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (HBRI)-এর মহাপরিচালক থাকাকালীন সময়েও তিনি ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
গণপূর্ত ভবনের ভেতরে এখন নাকি চলছে খোলাখুলি “কমিশন টেবিল”। কোনো কাজ পেতে চাইলে প্রথমে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে ৫%, নির্বাহী প্রকৌশলীকে ১০%, আর শেষে কায়কোবাদের অফিসে দিতে হয় আরও ৫% কমিশন। সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ না দিলে কোনো কাজ পাওয়া কার্যত অসম্ভব। কাজের মান, জনগণের সেবা বা প্রকল্পের গুণগত দিক—সবই সেখানে গৌণ।
সরকারি কর্মকর্তার বেতনে সংসার চালানো যেখানে কঠিন, সেখানে কায়কোবাদের জীবনযাপন যেন বিলাসিতার প্রতিমূর্তি। মোহাম্মদপুরে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, ধামরাইয়ে ১০ তলা ভবন, গ্রামের বাড়িতে বিপুল সম্পত্তি, লেটেস্ট প্রিমিও গাড়ি—সবকিছুই নাকি এসেছে “ভুয়া প্রাক্কলনের জাদুতে”।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই দালাল সাংবাদিক সিন্ডিকেট এখন শুধু দুর্নীতি আড়াল করছে না—বরং সত্যিকারের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদেরও হুমকি দিচ্ছে। যারা কায়কোবাদের কালো কারসাজি ফাঁস করতে সাহস দেখাচ্ছেন, তাদের ওপর নেমে আসছে ভয়ভীতি আর সন্ত্রাস।
ফলে গণপূর্ত অধিদপ্তর আজ যেন পরিণত হয়েছে “দুর্নীতির চিড়িয়াখানায়”—যেখানে প্রকৌশলী, ঠিকাদার, দালাল সাংবাদিক—সবাই দুর্নীতির পশু, শুধু নামের তফাৎ।
