খুলনা খাদ্য বিভাগে বস্তা সরবরাহে গরমিল, তদন্তের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ খুলনা জেলায় চলমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ মৌসুমে খাদ্য বিভাগের বস্তা কেনাকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি গুদামের জন্য নতুন বস্তা কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে পুরোনো, ব্যবহৃত ও নিম্নমানের বস্তা। এসব পুরোনো বস্তা নতুন বস্তার দামে কেনা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা খাদ্য বিভাগের জন্য নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং কার্যাদেশ পায় মেসার্স চন্দ্রদ্বীপ কনস্ট্রাকশন। এই টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয় প্রায় তিন মাস আগে, বর্তমান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সময়ে। টেন্ডার কমিটির প্রধান ছিলেন ফুলতলার পিসিএফ জাকির হোসেন, যিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে খুলনার সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বও পালন করছিলেন। দরপত্র অনুযায়ী নতুন বস্তা মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামে সরবরাহ করার কথা থাকলেও সেখান থেকেই বিভিন্ন গুদামে পুরোনো বস্তা ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রূপসা উপজেলার আলাইপুর খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৫০ হাজার এবং ৩০ কেজির ১০ হাজার বস্তা সরবরাহ করা হয়। তেরোখাদা খাদ্যগুদামে দেওয়া হয় ৫০ কেজির ৩০ হাজার ও ৩০ কেজির ১০ হাজার বস্তা। একইভাবে ডুমুরিয়া ও ফুলতলা খাদ্যগুদামেও বিপুল সংখ্যক বস্তা পাঠানো হয়। এছাড়াও মংলা সাইলো ও মোংলা পোর্টে জাহাজ থেকে খাদ্যশস্য খালাসের সময় অনেক বস্তা ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত দেওয়া এসব বস্তার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুরোনো বস্তা ছিল।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, অনেক বস্তার গায়ে আগের সরকারের স্লোগান ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ আলকাতরা দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি বস্তাগুলোর গায়ে উৎপাদন সাল হিসেবে ২০২২ লেখা রয়েছে, যা নতুন বস্তা দাবি করার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব তথ্য থেকেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে যে, এগুলো আসলে আগেই ব্যবহৃত বস্তা।

সূত্র বলছে, বাজারে বর্তমানে নতুন ৩০ কেজির বস্তার সরকারি দর প্রতি পিস প্রায় ৫০ টাকা, যেখানে পুরোনো বস্তার দাম ১৮ থেকে ২০ টাকার বেশি নয়। একইভাবে ৫০ কেজির নতুন বস্তার দাম যেখানে প্রায় ৯০ টাকা, সেখানে পুরোনো বস্তা পাওয়া যায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। এই দামের পার্থক্য দেখেই অভিযোগ উঠেছে, পুরোনো বস্তা কিনে নতুনের বিল দেখিয়ে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি খালিদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, প্রায় দুই লাখ নতুন বস্তা কেনার নামে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে। নতুন বস্তার আড়ালে পুরোনো ও নিম্নমানের বস্তা সরবরাহ করা হয়েছে, যা খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বস্তা সহজেই ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, ফলে খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এ বিষয়ে মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামের ম্যানেজার টিসিএফ মোশাররফ হোসেন জানান, একসাথে এত বিপুল সংখ্যক বস্তা পুরোপুরি খুলে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বস্তা দেখে গ্রহণ করা হয়। তেরোখাদা গুদামে পাঠানো ২০ হাজার বস্তার মধ্যে ৮ হাজার পুরোনো বস্তা ধরা পড়ার পর ভিডিও করে সরবরাহকারীকে জানানো হয় এবং পরে সেগুলো বদলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভীর হোসেনও স্বীকার করেছেন যে তেরোখাদা গুদামে কিছু পুরোনো বস্তা পাওয়া গিয়েছিল। তবে সরবরাহকারীকে জানানো হলে শর্ত অনুযায়ী সেগুলো পরিবর্তন করে নতুন বস্তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বড় পরিসরে বস্তা কেনার ক্ষেত্রে এমন সমস্যা মাঝে মাঝে হতে পারে এবং নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহকারী তা সমাধান করে থাকে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বস্তা বদল করলেই এই ঘটনার দায় শেষ হয়ে যায় না। পরিকল্পিতভাবে পুরোনো বস্তা নতুন হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি না, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে বিল পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। না হলে ভবিষ্যতেও খাদ্য বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের অনিয়ম চলতেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *