ওয়ালটনের ছায়ায় দুর্নীতির সাম্রাজ্য : ফ্যাসিবাদী প্রভাব, বিক্রয় প্রতিনিধিদের কান্না আর গণপূর্ত প্রকৌশলীদের বিলাসবহুল বিদেশ সফর

এসএম বদরুল আলমঃ ৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযানের সূচনা তখন সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সময়ের অল্প ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, সেই শাসনের প্রেতাত্মা এখনও জীবিত রয়েছে—আর সেই ছায়া আজও দৃশ্যমান দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ওয়ালটন গ্রুপের ওপর।

WhatsApp Image 2025 10 05 at 23.52.43 b9a9e4ee

অভিযোগ উঠেছে, ওয়ালটন মালিকপক্ষ বহু বছর ধরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে রেখেছিল। এই তালিকায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক সিআইডি’র একজন কর্মকর্তা এবং সাইবার সিকিউরিটি সেলের প্রধান মনিরুল ইসলাম। এই প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সহায়তায় ওয়ালটন সারা দেশের বিক্রয় প্রতিনিধিদের ওপর চালিয়েছে অমানবিক চাপ ও নির্যাতন।

জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনায় বিক্রয় প্রতিনিধিরা চোখের জলে জানান, তাদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করা হতো। কেউ অমান্য করলে হুমকি দেওয়া হতো চাকরিচ্যুতি, মামলার ভয় বা এমনকি গুম-খুনের আশঙ্কা পর্যন্ত। অনেকের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিনিধিদের মতে, ওয়ালটন তখন আর শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না—বরং এটি হয়ে উঠেছিল সাবেক সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রেতাত্মা।

এদিকে শিল্পখাতে একচেটিয়া প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে ওয়ালটন সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট সরবরাহ খাতে প্রবেশের চেষ্টা শুরু করে। দুদক সূত্রে জানা যায়, ওয়ালটনের অর্থায়নে গণপূর্ত অধিদপ্তরের চারজন নির্বাহী প্রকৌশলী ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইউরোপ সফরে গেছেন। সফরের নাম দেওয়া হয়েছিল “ইটালি ট্যুর”, কিন্তু এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওয়ালটনের লিফটকে বিদেশি মানের সমতুল্য ঘোষণা করানো, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি টেন্ডারগুলো একচেটিয়াভাবে তাদের হাতে আসে। এমনকি একজন প্রকৌশলী সফরে নিজের স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক এই সফরের বিষয়ে অবগত থেকেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। অনেক কর্মকর্তা একে “নীরব দুর্নীতি” বলে আখ্যা দিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও এ ভ্রমণ গোপনে সম্পন্ন হয়।

অন্যদিকে দেশের কিছু গণমাধ্যম এই সময় ওয়ালটনের দুর্নীতি আড়াল করতে তথাকথিত “সাফল্যের গল্প” প্রচার শুরু করে। “বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের গর্ব”, “বর্ষসেরা প্রতিষ্ঠান” ইত্যাদি শিরোনামে এসব প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। অনেকেই একে মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ও করপোরেট ধামাচাপা হিসেবে দেখছেন। বিক্রয় প্রতিনিধিদের কান্না, প্রশাসনিক আঁতাত ও টেন্ডার কেলেঙ্কারির খবর গোপন রাখাই ছিল এসব প্রচারণার মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ালটন এখন কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি হয়ে উঠেছে করপোরেট জুলুম, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতীক। একদিকে বিক্রয় প্রতিনিধিদের জুলুম, অন্যদিকে প্রকৌশলীদের বিদেশ সফরের কেলেঙ্কারি—সব মিলে ওয়ালটনের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, ওয়ালটনের মতো প্রতিষ্ঠানের এই দুর্নীতি সেই স্বপ্নে কালো দাগ ফেলছে। জনগণের দাবি—দুদক যেন অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনে এবং ওয়ালটনের মালিকপক্ষসহ তাদের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিচার নিশ্চিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *