ওয়াটার এটিএমে ৩০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, সরকারি অর্থে অবকাঠামো—ব্যবসার সুবিধা ড্রিঙ্কওয়েলের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল ওয়াটার এটিএম প্রকল্প। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা হয় শত শত বুথ। তবে এই প্রকল্প নিয়েই এখন উঠেছে বড় ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অর্থে অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রকল্প পরিচালনার সুবিধা পেয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রিঙ্কওয়েল (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড)। এমনকি প্রকল্পটি পরিচালনার সময় সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসার অর্থে ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম বুথের অবকাঠামো তৈরি করা হলেও এসব বুথ থেকে পানি বিক্রির আয়ের বড় একটি অংশ গেছে ড্রিঙ্কওয়েলের কাছে। প্রায় নয় বছর ধরে চলা এই ব্যবস্থায় ঢাকা ওয়াসার প্রকৃত আর্থিক লাভ কতটা হয়েছে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি কতটা সুবিধা পেয়েছে—তা নিয়ে এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশের দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম বুথের সিভিল স্ট্রাকচার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে ঢাকা ওয়াসার প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে গত প্রায় নয় বছরে এসব বুথে পানি বিক্রি করে ড্রিঙ্কওয়েল প্রায় ১৪০ কোটি টাকা পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে সরকারি অর্থে তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ব্যবসা করেছে এবং সেই ব্যবসা থেকে ঢাকা ওয়াসা কতটা সুবিধা পেয়েছে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব ভবনে ড্রিঙ্কওয়েলকে দীর্ঘদিন বিনা ভাড়ায় অফিস ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা ভাড়া ধরলে নয় বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যদি সত্যিই কোনো ধরনের ভাড়া ছাড়াই সরকারি ভবনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেন এবং কার অনুমোদনে করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সব হিসাব একসঙ্গে বিবেচনা করে অভিযোগকারীরা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ও সুবিধা দেওয়ার কথা বলছেন। তবে এই অর্থের পরিমাণ চূড়ান্তভাবে কত, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে ৩০০ কোটি টাকার দাবিটি সত্য কি না, তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ওয়াসার হিসাব, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, চুক্তির আর্থিক শর্ত, ব্যাংক লেনদেন, বুথভিত্তিক পানি বিক্রির তথ্য এবং প্রকল্পে কে কত টাকা বিনিয়োগ করেছে—এসব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রকল্পটি কীভাবে ড্রিঙ্কওয়েলের হাতে গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রতিযোগিতামূলক কোনো প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ওয়াটার এটিএম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট বা পিপিএ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা পিপিআরের বিধান কীভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, তা নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে যদি কোনো দরপত্র ছাড়া একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার আইনি ভিত্তি কী ছিল, কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছিল এবং কেন প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া হয়নি—এসব বিষয় তদন্তের দাবি রাখে।

এই চুক্তির সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খান-এর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাঁর সময়েই ড্রিঙ্কওয়েলকে ঘিরে এই ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয় এবং তাঁর প্রভাবের কারণে চুক্তিটি এগিয়ে যায়। তবে এ বিষয়ে তাকসিম এ. খানের বক্তব্য এবং চুক্তি অনুমোদনের সময়কার নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ড্রিঙ্কওয়েলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজ চৌধুরী এবং পরিচালক ইমতিয়াজ মোহাম্মদ মোহসিন-কে ঘিরেও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তাদের মাধ্যমে প্রকল্পে কোনো ধরনের প্রভাব বা বিশেষ সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।

এদিকে পুরোনো চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে আরও পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করার উদ্যোগের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ড্রিঙ্কওয়েলের পক্ষ থেকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর নতুন করে পাঁচ বছরের চুক্তির আবেদন করা হয়েছে।

এবারের প্রস্তাবেও যদি ওয়াটার এটিএমের অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বড় অংশ ঢাকা ওয়াসাকেই বহন করতে হয়, অথচ পরিচালনার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা ও মুনাফার সুযোগ পায়, তাহলে আগের কাঠামোই নতুন করে চালু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নতুন চুক্তির আগে পুরোনো চুক্তির পুরো হিসাব যাচাই করার দাবি উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, একই প্রতিষ্ঠানকে আবারও কেন পাঁচ বছরের জন্য সুযোগ দিতে হবে? নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে বিভিন্ন যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হবে না কেন? সরকারি অর্থে তৈরি অবকাঠামো ব্যবহারের বিনিময়ে ঢাকা ওয়াসা কী পরিমাণ অর্থ পাবে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি কী পরিমাণ আয় করবে—নতুন চুক্তিতে এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খান দায়িত্ব ছাড়ার পরও তাঁর সময়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ওয়াসার ভেতরে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের একটি অংশ ড্রিঙ্কওয়েলের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রেখে প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব দাবি সত্য কি না, তা জানতে চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, অনুমোদনকারী ব্যক্তি, আর্থিক লেনদেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি খতিয়ে দেখা দরকার।

শুধু আর্থিক বিষয় নয়, ওয়াটার এটিএম থেকে সরবরাহ করা পানির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চুক্তিতে যে ধরনের পানি শোধন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহারের কথা ছিল, সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পানি শোধনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ও সামনে চলে আসবে।

কারণ ওয়াটার এটিএম থেকে পানি নেওয়া মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন যে এটি নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি। তাই পানির মান পরীক্ষা, শোধন প্রক্রিয়া, ল্যাবরেটরি রিপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় সনদ নিয়মিত হালনাগাদ ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করা প্রয়োজন।

এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এত অভিযোগের পরও পুরোনো চুক্তির হিসাব শেষ না করে নতুন চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না। যদি আগের চুক্তিতে সরকারি অর্থের ব্যবহার, রাজস্ব বণ্টন, অবকাঠামোর মালিকানা, বিনিয়োগ এবং পরিচালন ব্যয়ে কোনো অসঙ্গতি থেকে থাকে, তাহলে সেগুলোর নিষ্পত্তি না করে নতুন চুক্তি করলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এ কারণে ওয়াটার এটিএম প্রকল্প নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তে বের করা প্রয়োজন—ড্রিঙ্কওয়েলকে কীভাবে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, পিপিএ ও পিপিআরের কোন বিধান অনুসরণ করা হয়েছিল, ঢাকা ওয়াসা এবং ড্রিঙ্কওয়েল কে কত টাকা বিনিয়োগ করেছে, ২৯৪টি বুথ থেকে মোট কত টাকার পানি বিক্রি হয়েছে, সেই অর্থের কত অংশ ঢাকা ওয়াসার হিসাবে গেছে এবং কত অংশ ড্রিঙ্কওয়েলের কাছে গেছে।

একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ভবনে বিনা ভাড়ায় অফিস ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছিলেন, সেই অনুমোদনের আইনি ভিত্তি কী ছিল, পানির মান পরীক্ষা কীভাবে করা হতো এবং নতুন পাঁচ বছরের চুক্তির প্রস্তাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ওয়াটার এটিএম প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে কম দামে নিরাপদ পানি দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যের পরিবর্তে যদি সরকারি অর্থে অবকাঠামো তৈরি করে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির দাবিসহ সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন চুক্তিপত্র, সরকারি হিসাব, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ব্যাংক লেনদেন, বিক্রয় তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে স্বাধীন তদন্ত।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—ঢাকা ওয়াসার ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম কি সত্যিই জনগণের জন্য সাশ্রয়ী পানি সরবরাহের প্রকল্প, নাকি সরকারি অর্থে তৈরি অবকাঠামোকে ব্যবহার করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে? পুরোনো চুক্তির হিসাব ও অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে নতুন পাঁচ বছরের চুক্তি করা হলে সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। তাই নতুন চুক্তির আগে পুরো প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের দাবি এখন সামনে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *