অন্ন ছত্রের সম্পদ গিলে খাচ্ছে পরিচালনা পর্ষদ—তদন্ত দাবি স্থানীয়দের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর নবাবপুরের শতবর্ষের জনহিতকর প্রতিষ্ঠান মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্টের কোটি-কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে ওই ট্রাস্টের সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে । সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ট্রাস্টের ওই চক্রটি পরিচালনার নামে দীর্ঘ বছর ধরে এই অন্ন ছত্র প্রতিষ্ঠানটিকে গিলে খাচ্ছে।

১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাস্টি বোর্ডের শত-শত কোটি টাকা মুল‍্যের মার্কেট, বাড়ি ও মুল‍্যবান সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালনার নামে বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের হোতাদের মধ্যে শিবুল (৫২), পরিমল (৬০) ও বিশ্বজিৎ (৫৫) এর নাম উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, পরিমল বাবু ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকলেও তিনি অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাস্টের অফিসে আসেন না। তার অবর্তমানে শিবুল ও বিশ্বজিৎ পরিচালনার সকল দায়িত্ব পালন করছেন। এই সুযোগে ট্রাস্টের কোটি-কোটি টাকা এই দুই অসাধু কর্তাসহ আরো কয়েক জনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করছে। সূত্র আরো জানায়, এই ট্রাস্টি বোর্ডের তপন পাল একজন অন্যতম সদস‍্য। তিনিও শারীরিক অসুস্থতার জন্য ট্রাস্টের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় শিবুল ও বিশ্বজিৎ ট্রাস্টের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়-ছয় করে বছরে বিপুল পরিমাণে টাকা আত্মসাৎ করছে বলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। এমনকি ট্রাস্টি বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছরের অডিট রিপোর্ট সকল সদস‍্যদের সামনে প্রদর্শন করার বিধান থাকলেও তারা তা করে না।

প্রাপ্ত তথ‍্যে জানা যায়, মদন- মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্টের এক সময় ১৯ টি বাড়ি ও ৭/৮ টি মার্কেট ছিল। ট্রাস্টি বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তা ও অসাধু পরিচালনা পর্ষদের কারণে সেসব হাতছাড়া হয়ে ৭/৮ টি বাড়ি ও মার্কেটের পরিসংখানে নেমে এসেছে। এর মধ্যে মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্টের নবাবপুর সড়কে ১২২, ১৬৭, ১৯২, ১৯৩, ১৯৪ নং হোল্ডিংয়ে রয়েছে ৫ টি বহুতল মার্কেট ও আবাসিক ভবন। এছাড়া কোতোয়ালি থানার পাটুয়াটুলির ইসলামপুর সড়কে ৫১/এ হোল্ডিংয়ে (১০ তলা) বাবুলী ইসলামপুর কমপ্লেক্স ও ওয়াইজঘাট সড়কে ৩/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে (১১ তলা)বাবুলী স্টার সিটি আবাসিক ও মার্কেট নামে ২ টি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন রয়েছে।

সরেজমিন তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, মদন-মোহন অন্য ছত্র ট্রাস্টের এই পরিচালনা পর্ষদের কর্তাব্যক্তি সিইও বিশ্বজিৎ,ম‍্যানেজার পরিমল ও হিসাব রক্ষক শিবুল গোপনে বাবুলী ডেভলপার কোম্পানিকে ভবন নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক ও আবাসিক ফ্লোর বিক্রয়ের ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন আম- মোক্তারনামা দিয়ে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে । এই ১১ তলা ভবনের ৪ তলা থেকে ১১ তলা পর্যন্ত ৫৬ টি ফ্লাট এবং নিচ তলা থেকে ৩ তলা পযর্ন্ত বাণিজ্যিক ফ্লোরের পজিশন বিক্রি করেছে ওই ভবন নির্মাতা কোম্পানি।এছাড়া একইভাবে ওই নির্মাতা কোম্পানিকে কোতোয়ালির ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলি সড়কে ৫১/এ নম্বর হোল্ডিং এর ১০ তলা ভবনটির সকল ফ্লোরের পজিশন বিক্রি করে শত-শত কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে ওই বাবুলী ডেভলপার কোম্পানি লিমিটেড।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ১০ তলা এই বাবুলী ইসলামপুর কমপ্লেক্স মার্কেটটির নির্মাণ ও বিক্রির ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন আম-মোক্তারনামা হস্তান্তর করে গোপন চুক্তির ৬০ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ট্রাস্টের সিইও বিশ্বজিৎ,হিসাবরক্ষক শিবুল ও পরিমলরা। ওই আম-মোক্তারনামা গ্রহিতা কোম্পানি মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্টের দায়িত্বশীল কর্তাদের প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে বছরের পর বছর ভবনটি নির্মাণাধীন দেখিয়ে বছরে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করছে। এছাড়াও নবাবপুরের ১২২, ১৬৭, ১৯২, ১৯৩,১৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে রয়েছে আরো ৫ টি বহুতল মার্কেট। এসব ট্রাস্টের মার্কেট থেকে প্রতিমাসে অর্ধ কোটি টাকারও বেশি ভাড়া আদায় হয় বলে জানা যায়।

একাধিক নির্ভরশীল সূত্র জানায়, প্রতি মাসে ট্রাস্টের অধীনে কোটি টাকারও বেশি ভাড়া আদায় হলেও ওই টাকা ট্রাস্টের ব্যাংক হিসেবে জমা না করে শিবুল ও বিশ্বজিৎ সহ আরো কয়েকজন মিলে তাদের ভোগ বিলাসে ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বজিৎ ও শিবুল এর ২ টি করে পাসপোর্ট রয়েছে। তারা এই ট্রাস্টের কোটি-কোটি টাকা আত্নসাৎ করে ভারতে সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

সূত্র আরো জানায়, প্রতিষ্ঠানটির শুরুতে প্রতিদিন শতাধিক অনাথ, অসহায় ও হতদরিদ্র লোকের মুখে দৈনিক একবেলা ডাল- ভাত ও ভাজি তুলে দিলেও বর্তমানে তা বিলুপ্ত হয়ে ৪০/৫০ এ নেমে এসেছে। এই ট্রাস্টি বোর্ডের সিইও বিশ্বজিৎ ও ক‍্যাশিয়ার হিসেবে খ‍্যাত শিবুল বাবু বিভিন্নভাবে অহেতুক ব‍্যয় দেখিয়ে প্রতিবছর ট্রাস্টের কোটি-কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কয়েক মাস পূর্বে বিশ্বজিৎ,পরিমল ও শিবুল এর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ পড়ায় তদন্ত শুরু হয়। এক পর্যায়ে তাদের পক্ষে কতিপয় হলুদ সাংবাদিকের হস্তক্ষেপের জন্য ওই যাত্রায় রক্ষা পায় তারা। ট্রাস্টি বোর্ড ও পরিচালনাকারী ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব‍্যবস্থা না নিলে শতবর্ষী এই মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্ট নামক ঐতিহ্যবাহী জনহিতকর সেবামুলক প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই বিলুপ্ত হবার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে শিবুল ও বিশ্বজিতের সাথে স্বশরীরের যোগাযোগ করলে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিশ্বজিৎ বাবু জানান, আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। অপরদিকে শিবুল বাবু জানান, আমরা প্রতিদিন ৩শ থেকে ৩৫০ জন অনাথ অসহায় লোকদের সকালে খাবার পরিবেশন করি। তিনি আরো বলেন,সত‍্যিকারে আমাদের ট্রাস্টে অনেকগুলি মার্কেট ও আবাসিক ভবন আছে কিন্তু ওইসব মার্কেটে দোকানের পজিশন ও বাড়ির ফ্ল্যাট পুর্বেই বিক্রি করা হয়েছে। আমরা নাম মাত্র জমিদারি ভাড়া পেয়ে থাকি। তবে পজিশন ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।

তার এসব তথ‍্যের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন তথ‍্যানুসন্ধান চালিয়ে বাস্তবতার সাথে কোন মিল পাওয়া যায়নি। এছাড়া সম্প্রতি অসহায়- আনাথদের মাঝে খাবার বিতরণের সময় উপস্থিত হয়েও ৮২ জনের বেশি অনাথ অসহায়দেরকে সবজি, ডাল, ভাত পরিবেশন করতে দেখা যায়নি। নবাবপুরের এই মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্টের শত-শত কোটি টাকা যেসব কর্মকর্তারা পরিচালনার নামে আত্মসাৎ করছে সকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব‍্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছে অসহায় অনাথ ওই হতদরিদ্র লোকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *