পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কে এগিয়ে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। এখন রাজ্যের রাজনৈতিক বাতাসে অপেক্ষার ভারী চাপ, ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে। সেদিনই স্পষ্ট হবে রাজ্যের মানুষ কাকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছেন।

কিন্তু ফল ঘোষণার আগেই বুথফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোল নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থা তাদের নিজস্ব হিসাব তুলে ধরছে, আর সেই হিসাব ঘিরেই তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক জল্পনা।

তবে এই সমীক্ষাগুলো নিয়ে গণমাধ্যমের অবস্থান স্পষ্ট, তারা তথ্য তুলে ধরছে, কিন্তু তার দায় বা দায়িত্ব নিচ্ছে না। কারণ মাঠপর্যায়ে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলে যে সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরি হয়, তার অনেকটাই অনুপস্থিত বর্তমান এক্সিট পোলের পদ্ধতিতে।

সমীক্ষাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। কিছু সমীক্ষা বিজেপিকে এগিয়ে রাখছে, আবার কিছুতে তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনের আভাস।

ভোট শতাংশের হিসাবে বিজেপি প্রায় ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত, অন্যদিকে তৃণমূলের ভোট শেয়ার ৪০ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। এই অঙ্ক কাগজে-কলমে বিজেপিকে সামান্য এগিয়ে রাখলেও বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। সে ক্ষেত্রে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি। তবে তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরতে পারে, তাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ইতিহাস বলছে, এক্সিট পোল সব সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসে, কিন্তু সেই সময়ের সমীক্ষাগুলো এত বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারেনি।

সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে ক্ষোভ, সাধারণ মানুষের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে বিস্ফোরিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আজও এক্সিট পোল নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

২০১১-এর পর ২০১৬, ২০২১ এবং বিধানসভা নির্বাচন কিংবা রাজ্যের লোকসভা নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে, সমীক্ষার ফলাফল অনেক সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি। এর পেছনে একটি বড় কারণ হিসাবে উঠে আসছে মাঠপর্যায়ে সমীক্ষার অভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডেটার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।

মোবাইল, এআই এবং সীমিত স্যাম্পল সাইজের কারণে বাস্তব জনমতের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটছে না। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

চাকরি কেলেঙ্কারি, গরু পাচার, কয়লা পাচার, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, এসব বিষয় সমাজের সচেতন অংশের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। আরজিকর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছিল। এসব ঘটনাই বিরোধী শক্তির হাতে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

তবে একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট। তৃণমূল সরকার গত ১৫ বছরে যে পরিমাণ সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, কৃষকবন্ধু, যুবশ্রী, আবাস যোজনা, পানীয় জল প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ, শৌচালয় এসব প্রকল্প সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রকল্পগুলোই ভোটের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নিয়েছে।

এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়ার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।

এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে নিজেদের ভোটার স্লিপের কপি সংরক্ষণ করেছেন। এই বিষয়টি ভোটদানের হার বৃদ্ধির একটি কারণ হিসাবেও দেখা হচ্ছে।

৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদান বাংলার নির্বাচনি ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। এত বেশি ভোটদানের অর্থ মানুষ নিজেদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক চাপ কাজ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্ব, পরিচয় এবং নিরাপত্তা একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। এই ইস্যুতে তৃণমূল সরকার যে অবস্থান নিয়েছে, তা অনেক ভোটারের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণের ইস্যু তুলে ধরেছে, যা কিছু এলাকায় প্রভাব ফেললেও সামগ্রিক ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সবদিক বিবেচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট, এবারের নির্বাচন একতরফা নয়।

লড়াই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অতীতে যেখানে হাজার হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় নির্ধারিত হতো, এবার সেই ব্যবধান কমে আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে একটি সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারে, তবে বিরোধী শক্তি বিশেষ করে বিজেপি ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবে। রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও সূক্ষ্ম হবে, আর বিরোধীদের চাপ বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *