কার্গোতে ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাসের অভিযোগ, সপ্তাহে ৮০ লাখ টাকা ঘুষের দাবি—কাস্টমস কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের সম্পদ-লেনদেন অনুসন্ধানের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাস, ঘুষ গ্রহণ, চোরাচালানে সহযোগিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সোহেল রানা নামে এক ব্যক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
আবেদনে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি করা হয়েছে, সেটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সকে ঘিরে। সোহেল রানার দাবি, একটি এয়ারওয়ে বিলের বিপরীতে প্রায় ৫৬ কার্টন পণ্য কাস্টমসের নিয়মিত বিল অব এন্ট্রি ও ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই কার্গো এলাকা থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের মোট ওজন আনুমানিক ১ হাজার ৯৬২ কেজি এবং অভিযোগকারীর হিসাবে এগুলোর মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই চালানে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, এলসিডি, ই-সিগারেট এবং সিগারেটের ব্যান্ডেরোল বা সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্পের মতো পণ্য থাকতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক ও কর পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই এসব পণ্য বের হয়ে থাকলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোহেল রানা দাবি করেছেন, এই ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, গেট পাস, পণ্য বের হওয়ার রেকর্ড, ওয়্যারহাউসের মজুত তালিকা, কার্গো মুভমেন্টের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিল ও বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওই সময় দায়িত্বে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টারও যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি বন্ধ বা কার্যক্রমহীন বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া বা অসঙ্গতিপূর্ণ নথি তৈরি করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো তখন কার্যকর ছিল কি না, তাদের বন্ড সুবিধা বহাল ছিল কি না এবং আমদানির পর পণ্য কোথায় গেছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করা হয়েছে।
শিশুখাদ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন সোহেল রানা। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় বিএসটিআই ছাড়পত্র বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক অনুমোদন না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে এসব পণ্য খালাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আমদানি নথি, পরীক্ষাগারের ছাড়পত্র এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে। সোহেল রানার দাবি, বিভিন্ন কাস্টমস কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন। তবে এই অর্থ লেনদেনের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক রেকর্ড, রসিদ বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য আবেদনের সঙ্গে রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে আবেদনকারী উল্লেখ করেছেন।
ঘুষের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য আমিনুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, নগদ অর্থের গতিবিধি, সম্পত্তি কেনাবেচা এবং আয়কর নথি পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের তথ্যও যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে ‘গুনগুন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কাস্টমস সরকার মো. আবু হানিফ এবং হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের যোগাযোগ ও যোগসাজশের কথাও বলা হয়েছে। তবে এই যোগাযোগের ধরন বা কোনো আর্থিক লেনদেনের নির্দিষ্ট প্রমাণ আবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, আমদানির নথি, বিল অব এন্ট্রি, পণ্যের প্রকৃত মূল্য, ঘোষিত মূল্য, পরিশোধিত শুল্ক এবং পণ্যের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
মো. আমিনুল ইসলামের ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের মধ্যেও সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে। সোহেল রানার আবেদনে তাঁর আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ এবং দেশে-বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কাস্টমস কার্যক্রম থেকে কথিতভাবে পাওয়া অবৈধ অর্থের একটি অংশ মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা যাচাই করতে ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সোহেল রানা দাবি করেছেন, আমিনুল ইসলাম এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেসব কর্মস্থলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের নথি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগকারীর মতে, আগের কর্মস্থলের দায়িত্বকালীন কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
বিমানবন্দর কার্গোতে কথিত ৩০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য খালাসের অভিযোগটি তদন্তের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সোহেল রানা। তাঁর আবেদনে কার্গো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, ওয়্যারহাউস ইনভেন্টরি, কার্গো মুভমেন্ট রেকর্ড, গেট পাস, ডেলিভারি রেকর্ড, এয়ারওয়ে বিল, বিল অব এন্ট্রি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টার সংরক্ষণের অনুরোধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা প্রশাসনিক নথি থাকলে সেগুলোও সংগ্রহ করে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। এতে পণ্যগুলো আসলে কখন কার্গোতে প্রবেশ করেছে, কোন প্রক্রিয়ায় বের হয়েছে এবং বের করার সময় কারা দায়িত্বে ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।
তবে লিখিত আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে ঘুষের পরিমাণ, ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাস, অর্থপাচার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথিত যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি ও আর্থিক তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
এ বিষয়ে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান, মো. আবু হানিফ, হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত ব্যক্তিরা এবং ‘ক্লোজেট ক্লাউড’-এর সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তদন্তের চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
সোহেল রানা তাঁর আবেদনে অভিযোগগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এখন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় বা দুদক কী ধরনের অনুসন্ধান করে এবং বিমানবন্দরের কার্গো-সংক্রান্ত নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের মাধ্যমে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিই দেখার বিষয়। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের গুরুতর ঘটনায় পরিণত হতে পারে; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট হবে।
