সৌদির বিমান হামলায় উত্তপ্ত ইয়েমেন, রিয়াদেরও বিপদ বাড়ছে

হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তুতে ভারি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সম্প্রতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় কৌশলগত এলাকাগুলো দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর হুতি বিদ্রোহীরা তাদের অবস্থান আরও শক্ত করে তুলেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ইয়েমেন সীমান্তে নতুন করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
রণক্ষেত্রের চিত্রে দেখা গেছে, ইয়েমেনের আল জাউফ প্রশাসনিক অঞ্চলে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর ওপর হুথিদের তীব্র আক্রমণের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে বিদ্রোহীদের সাঁজোয়া যান দখল এবং মরুভূমির বালি ভেদ করে বিশালাকার ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা যায়। হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি করেছেন, তাদের প্রতিরোধ বাহিনী একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও রিয়াদের পক্ষ থেকে এই দাবির কোনো সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। সারি আরও জানান, গত এক সপ্তাহেই সৌদি আরব ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সাড়ে চার শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারও স্বীকার করেছে যে সৌদি ও তাদের যৌথ বাহিনী হুথি অবস্থানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে অবনতি হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবে বসবাসরত তাদের সরকারি কর্মচারীদের ইয়েমেন সীমান্ত থেকে ২০ মাইলের মধ্যে ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপ দখল করে নেওয়ার পর হুতি সৌদি আরবের ভেতরেও ঘন ঘন রকেট ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সৌদি রিয়াদ জানিয়েছে, পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে তারা একটি হুতি ড্রোন ধ্বংস করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, মক্কার পবিত্রতার কাছাকাছি এ ধরনের হামলা সব সীমা লঙ্ঘন করেছে। তবে হুতি মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে সস্তা অপপ্রচার বলে দাবি করেছে।
চলমান এই সহিংসতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৮ ডলারের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইয়েমেন সংকটের পাশাপাশি ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের প্রধান ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপত্তি আরও বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের প্রায় চার শতাংশ এই পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। একদিকে এই অঞ্চলে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের বিস্তার বিশ্বব্যাপী মার্কিন অর্থনীতিকে বিপদে ফেলছে, অন্যদিকে সরাসরি নতুন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের এই যুদ্ধ বিস্তার যদি দ্রুত থামানো না যায়, তবে তা কেবল একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক মানচিত্রে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকট তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
