বদলি, পদোন্নতি ও টেন্ডার ঘিরে প্রশ্ন: গণপূর্তের শীর্ষ পদে খালেকুজ্জামানের বিতর্কিত উত্থান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়া, ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতা অমান্য করে পদোন্নতি, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেও পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের পেছনে ফেলে খালেকুজ্জামান গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেন তিনি। এই বলয়ের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই সময় অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে একটি নির্দিষ্ট মহলের প্রভাব বাড়তে থাকে।

এই সিন্ডিকেটে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলি হওয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর নাম রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এসব কর্মকর্তার মাধ্যমে সমন্বয় করা হতো। যদিও অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণিত অপরাধের স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।

গণপূর্তের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্বচ্ছতা আনতে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলির ব্যবস্থা করা হলেও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে সেই স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, লটারি হওয়ার আগেই পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা হয়। পরে সেই নাম ওঠার মাধ্যমে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

বদলি প্রক্রিয়ায় নিজ জেলা বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে পদায়নের নিয়ম থাকার কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের অন্য বিভাগে দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। পাশাপাশি ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং না দেওয়ার নীতির কথাও বলা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে আগে থেকেই কয়েকজনের নাম ঢাকা জেলার লটারির বাক্সে রাখা হয়। পরে তাদের নাম লটারিতে ওঠার পর ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়।

এ নিয়ে কয়েকজন প্রকৌশলী কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকা বিভাগের জন্য ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে আলাদা দুটি লটারির বাক্স রাখা হলেও ঢাকা জেলার বাক্সে দেশের অন্য এলাকার কর্মকর্তাদের নাম কীভাবে যুক্ত হলো, সেটি পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে লটারির আগে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

বদলির ক্ষেত্রে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে, গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগে এবং ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে এ এস এম সাখওয়াত ইসলামকে মিরপুর উপবিভাগে এবং রেজাউল করিম মিঠুকে ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম এর আগে রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ এবং শেরে-বাংলা উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাড়ি বগুড়ায় হলেও আবার ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল গণপূর্ত উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩ এবং মহাখালী উপবিভাগ হয়ে ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭-এ দায়িত্ব পালন করার পর এবার ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে পদায়ন পেয়েছেন।

জয় চৌধুরীর বদলি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তার নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে লটারিতে ওঠার পর নিজ জেলার কারণ দেখিয়ে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয় বলে অভিযোগ। অথচ ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমানকে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ এবং মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হকের ক্ষেত্রেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তাদের নিজ জেলা ঢাকা বিভাগের মধ্যে হলেও তাদের চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম একই সঙ্গে ফরিদপুর ও নরসিংদীর লটারিতে ওঠার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে ফরিদপুরে পদায়ন করা হয়।

আরেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদ চাকরিজীবনে ঢাকার বাইরে দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ বা হাইকোর্ট এবং পরে তেজগাঁও উপবিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মো. মামুনুর রশিদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় সাভারে দায়িত্ব পালনের পর চট্টগ্রামে বদলি এবং এক বছরের মধ্যে গাজীপুরে পদায়নের পর আবার ঢাকায় পোস্টিং পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের ক্ষেত্রেও লটারি প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তার নাম ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় থাকার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে তিনি শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন পান বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে শুধু অনিয়ম নয়, অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীকে পছন্দের কর্মস্থলে নেওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এসব অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পোস্টিং দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও রয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মার্চ একদিনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলির আগে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয় বলে জানা গেছে। তার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির বড় একটি অংশ বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এদিকে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শুধু বদলি বাণিজ্য নয়, প্রকল্পের বিল নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো প্রকল্পের কাজকে একাধিক প্যাকেজ হিসেবে দেখিয়ে প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। কোথাও কাজ শেষ না করেই বিল দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত ঘটনা, ব্ল্যাকমেইল, দলীয় প্রভাব ব্যবহার এবং অফিসে বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগের তথ্য থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে যেসব কর্মকর্তা সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা দায়িত্ব থেকে সরানো হয়, তাদের আবার চাকরিতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে পুরোনো এবং গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার। সরকারি নথি অনুযায়ী, উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে যাওয়ার জন্য তিনি যে পিএইচডি সনদ ব্যবহার করেছিলেন, সেটি নিয়ে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে সনদ জালিয়াতি ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি নিজের দোষ স্বীকার করেছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে তাকে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রাখার মতো লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর প্রভাবেই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খালেকুজ্জামান তাকে ফুফু বলে ডাকতেন বলেও বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। শাস্তি পাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন। এরপর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদেও পদোন্নতি পান। ফলে একই বছরে দুই দফায় পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে বিভিন্ন সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেছেন খালেকুজ্জামান—এমন তথ্যও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই তিনি দেশে ফিরে আসতেন। ফলে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও কীভাবে তিনি ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

খালেকুজ্জামানের পদোন্নতির পথ পরিষ্কার করতে তার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মীকে টার্গেট করার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার প্রতিযোগিতায় থাকা সিনিয়রদের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলা ও বিভিন্ন অভিযোগের নথি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে বা এসএসবিতে পাঠানো হয়। এতে তাদের পদোন্নতির পথে বাধা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় মো. আবুল খায়ের, উৎফল কুমার দে এবং মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা খালেকুজ্জামান নিজের নামকে প্রথম দিকে রাখেন। একই সঙ্গে মো. শহিদুল আলম এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারের নামও সংশ্লিষ্ট তালিকায় ছিল।

এ নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, রামপুরা থানার একটি মামলায় কৌশলে ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম যুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়টি এসএসবির সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব মামলা ছিল সাজানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ আটকে দেওয়ার কৌশল। তবে মামলাগুলোর প্রকৃত কারণ ও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনগত তদন্ত প্রয়োজন।

খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশা অনুমোদন নিয়ে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভবনটিতে ৪৬ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও অনেকে আহত হন। পরে তদন্তে উঠে আসে, ২০১১ সালে ভবনটির নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তৎকালীন রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সম্পৃক্ততা ছিল।

তদন্তে ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকা এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপদে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। এত বড় প্রাণহানির পর ভবনটির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে নিজের সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেখানোর জন্য খালেকুজ্জামান বিভিন্নভাবে তদবির করেছিলেন। যদিও ভবনটির নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসারসহ অন্যান্য কর্মকর্তার দায়িত্বের বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্তের দাবি রাখে।

এতসব অভিযোগের মধ্যেই ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই বদলি, পদোন্নতি, টেন্ডার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও বাড়তে থাকে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও জানা গেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্যও রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবগত। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন। তাই তাদের ক্ষেত্রে লটারির পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি করা হবে। সিনিয়র প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কোনো প্রতিযোগী নেই।

অন্যদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেছেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে না—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে থাকা সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা সংক্রান্ত নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং তাদের হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মকর্তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ আসছে এবং বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি আরও জানান, খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেয়েছেন এবং জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার অবস্থান তৃতীয়। প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের জন্য যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে।

ফলে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন শুধু ব্যক্তিগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি, পদোন্নতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপরও প্রশ্ন তুলছে। ভুয়া সনদ ব্যবহারের পুরোনো অভিযোগ থেকে শুরু করে বর্তমান বদলি-পদায়ন, প্রকল্পের বিল, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা—সব অভিযোগেরই নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেগুলোর বিষয়ে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *