এলজিইডিতে পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ, ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেনের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)–তে পদোন্নতি ঘিরে ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। গত মার্চে ৯০ জন কার্যসহকারীকে সার্ভেয়ার এবং ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৯০ জন কার্যসহকারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা করে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীর প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। দুই দফার হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
টাকা দেওয়ার দাবিদারদের বক্তব্য, ব্যাংক লেনদেন, যোগাযোগের রেকর্ড, নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
বদলি-পদায়নেও কথিত ‘রেট’
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে ঘিরে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশলী ও সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর বদলিতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা, উপসহকারী প্রকৌশলীর বদলিতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলিতে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত কথিত ‘রেট’ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পছন্দের পদ বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের এক ধরনের অঘোষিত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। টাকা না দিলে বদলি বা পদায়ন আটকে থাকার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
পদোন্নতির তালিকা যাচাইয়ের দাবি
৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার অভিযোগের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এসব পদোন্নতি হয়েছে? এ জন্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত ২২৭ কর্মকর্তার তালিকা, পদোন্নতির নথি, সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষের নথি, সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের বিবরণী যাচাই করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রত্যেকের কাছ থেকে একই হারে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে এত বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো আর্থিক বা যোগাযোগের চিহ্ন থাকার কথা।
প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ
বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, সংশোধিত প্রাক্কলন ও বিল অনুমোদন ঘিরেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি বড় সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ঠিকাদারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং গ্রামীণ সড়ক-সেতু প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, বিল, সংশোধিত প্রাক্কলন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সম্পদের সঙ্গে আয়ের মিল কতটা?
প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রংপুর শহরে বহুতল বাড়ি, ঢাকার পল্লবীতে একাধিক ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট এবং রংপুর ও কুড়িগ্রামে বিপুল পরিমাণ জমিসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া একাধিক ইটভাটা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে ভূমি রেজিস্ট্রি, রাজউকের নথি, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব যাচাই করা জরুরি।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও
বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি দীর্ঘদিন নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
সচিবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
বেলাল হোসেনকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার উদ্যোগে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহিদুল হাসানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বেলালকে ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সচিবের প্রভাব রয়েছে। এমনকি তাঁকে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উদ্যোগেরও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে সচিবের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
৯ কোটি ৫৫ লাখ –এর তদন্ত হবে?
এলজিইডি দেশের গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও বদলিতে ঘুষের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও মান নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করবে।
তাই ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার কথিত পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগের পাশাপাশি বদলি-পদায়নের কথিত ‘রেট’, প্রকল্প পরিচালকের নিয়োগ, টেন্ডার, বিল এবং প্রধান প্রকৌশলীর সম্পদের বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহিদুল হাসান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া জরুরি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
