ডিপিএইচইতে ‘রাম-রাজত্ব’র অভিযোগ: এনএসআই রিপোর্ট ও অর্থ লেনদেনের রহস্য উন্মোচনে তদন্ত জরুরি

​নিজস্ব প্রতিবেদক : জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) যেন নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করেই ক্ষমতার একচ্ছত্র বলয় গড়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আর সেই বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল আউয়াল। গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য থাকার অভিযোগ সত্ত্বেও অস্বাভাবিক দ্রুততায় অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো তার দখলে যাওয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

​অভিযোগ রয়েছে, নিজ পদের অতিরিক্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা আব্দুল আউয়াল মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। ফলে অধিদপ্তরের শীর্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন নজিরবিহীন না হলেও অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন থাকার অভিযোগ।

​এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে গুরুতর তথ্য, তবুও ‘পুরস্কার’ !
​সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা—এনএসআইয়ের একটি প্রতিবেদনে আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর তথ্য উঠে আসে। এমন প্রতিবেদন থাকার পর স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তার দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।
​অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রতিবেদনের বিষয়টি কার্যত পাশ কাটিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে আব্দুল আউয়ালকে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি পান প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বও।

​এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যদি সত্যিই গুরুতর অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই তাকে কেন অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো?

​’৩৫ কোটি টাকার খেলা’—দায়িত্ব পেতে বিপুল অর্থ লেনদেন ?
​আব্দুল আউয়ালকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব বাগিয়ে নিতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি।
​অভিযোগ রয়েছে, কথিত এই বিপুল অর্থের মধ্যে ৫ কোটি টাকা সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীকে এবং অবশিষ্ট অর্থ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে পৌঁছেছে।

​তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, কল রেকর্ড, দায়িত্ব প্রদানের নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ফাইল পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
​সিনিয়রদের টপকে এত দ্রুত উত্থান কীভাবে ?

​সরকারি প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করা হয়। অথচ আব্দুল আউয়ালের ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সেখান থেকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনায় সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

​সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার প্রশ্ন, একই কর্মকর্তাকে কেন একের পর এক শীর্ষ দায়িত্ব দেওয়া হলো? আরও বড় প্রশ্ন—তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কি এই দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না?

​সাবেক ছাত্রলীগ পরিচয় কি প্রভাবের কারণ ?
​আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনের ভেতরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
​তবে শুধু কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অতীত সম্পৃক্ততা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই।

​’রাম-রাজত্বে’ অধিদপ্তরের স্বাভাবিক প্রশাসন প্রশ্নের মুখে?
​একজন কর্মকর্তার হাতে একই সময়ে অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যেখানে একটি দায়িত্ব পাওয়াই অনেক কর্মকর্তার জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়, সেখানে একজন কর্মকর্তা অল্প সময়ের মধ্যে শীর্ষ তিনটি পদে দায়িত্ব পেলেন কীভাবে—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

​বিশেষ করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অভিযোগ এবং কথিত ৩৫ কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসায় পুরো প্রক্রিয়াটি এখন তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

​তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য :
​আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিছক গুঞ্জন, নাকি এর পেছনে রয়েছে শক্ত প্রমাণ—তা বের করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এ ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কথিত এনএসআই প্রতিবেদন, দায়িত্ব প্রদানের সব সরকারি আদেশ, জ্যেষ্ঠতা তালিকা, প্রশাসনিক নথি এবং কথিত ৩৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। ​একই সঙ্গে সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে অর্থ পৌঁছানোর অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য।

​কারণ প্রশ্নটি শুধু একজন কর্মকর্তার পদায়ন নিয়ে নয়; প্রশ্নটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিয়ে। ​এখন দেখার বিষয়, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অভিযোগ কি সত্যিই ধামাচাপা পড়বে, নাকি ৩৫ কোটি টাকার কথিত লেনদেনের রহস্য উন্মোচনে শুরু হবে নিরপেক্ষ তদন্ত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *