যুব মহিলা লীগ নেত্রী এষা:২৪-এর আন্দোলন দমনের অভিযোগে এখনো পলাতক

db5c6406 e73e 42ee a960 e98788491c32নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, আন্দোলন প্রতিহত করার অপ- তৎপরতা এবং সহিংসতার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বহু নেতা-কর্মীর নাম সামনে এসেছে। এবার সেই তালিকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আকলিমা আক্তার এষার নাম।

অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিলেন এষা। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, তৎকালীন ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাপ্পির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকে আন্দোলন প্রতিহত করার বিভিন্ন তৎপরতায় তিনি যুক্ত ছিলেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ পর্যন্ত এষার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মিরপুর-১০-এ কী ঘটেছিল ?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় মিরপুর-১০ এবং আশপাশের এলাকায় ছাত্র-জনতার কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কয়েক দফা উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং আন্দোলন প্রতিহত করার অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর নামের পাশাপাশি এষার নামও উঠে আসে।স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ৫  আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তৎকালীন কাউন্সিলর বাপ্পির সঙ্গে থেকে এষা আন্দোলনবিরোধী তৎপরতায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে অভিযোগকারীরা এখনো প্রকাশ্যে এমন পর্যাপ্ত নথি, ছবি, ভিডিও বা যাচাই করা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেননি, যার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় এষার সরাসরি ভূমিকা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই সময়কার ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি পরীক্ষা করে প্রকৃত সত্য বের করা হচ্ছে কি না।6c7f8e1f 99cc 4a91 90d3 6a7723d1b6d8

কাউন্সিলর বাপ্পির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ৷ :

একটি বিশেষ সূত্রের দাবি, এষা ও তৎকালীন কাউন্সিলর বাপ্পি একই এলাকায় কাছাকাছি বাড়িতে বসবাস করতেন। এ কারণে তাদের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে দাবি সূত্রটির। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাদের একসঙ্গে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। আর আন্দোলনের উত্তাল সময়েও এই রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দোলনবিরোধী তৎপরতায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এষার বিরুদ্ধে।তবে এই দাবিগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মিরপুর-১০ এলাকায় তাদের অবস্থান, যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করলেই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

04fee054 2234 4630 8c71 1eb28386bc71

ছাত্রলীগ থেকে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আকলিমা আক্তার এষা একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পান। এরপর যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচিতি এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে অবস্থানের কারণে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নয়; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে তথ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

91c96e57 ac78 46e2 abdf 9db2550dd7db

আটক হওয়ার গুঞ্জন, কিন্তু নিশ্চিত নয়:

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের আন্দোলনকেন্দ্রিক হামলা ও সহিংসতার অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্তের খবর সামনে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি আকলিমা আক্তার এষা আটক হয়েছেন—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত সেই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে এষা বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, দেশে নাকি দেশের বাইরে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা, তদন্ত কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন উঠছে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে:

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে হামলা ও সহিংসতার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা কি একই মানদণ্ডে তদন্ত করা হচ্ছে? বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এষার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে তার ভূমিকা কী ছিল, কার নির্দেশে বা কার সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি মাঠে ছিলেন কি না, কোনো হামলা বা সহিংসতার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হলে নিরপেক্ষ তদন্তের বিকল্প নেই।

b8526b00 637c 4022 bd45 adbbfec99da0অন্যদিকে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুঞ্জনের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি গুরুতর অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচয়ের কারণে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

এই রিপোর্ট প্রকাশ পর্যন্ত আকলিমা আক্তার এষা, সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পি এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। এখন মূল প্রশ্ন একটাই—মিরপুর-১০-এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে এষার প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল? অভিযোগ, নাকি প্রমাণযোগ্য সম্পৃক্ততা? উত্তর মিলবে কেবল নিরপেক্ষ তদন্তেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *