মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফেরত ও ৩% সুবিধা নিয়ে ক্ষোভ, SK+F-এর পণ্য বয়কটের ঘোষণা

বিশেষ প্রতিবেদক : স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান SK+F- এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কেমিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৈঠকে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন একদল ওষুধ ব্যবসায়ী।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন মো. কামাল হোসেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি (বিসিডিএস) ক্যান্টনমেন্ট থানার সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ‘জাগ্রত কেমিস্ট বাংলাদেশ’- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

তার পোস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, SK+F-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণে ‘জাগ্রত কেমিস্ট বাংলাদেশ’- এর নেতৃত্বে প্রায় ৩৫টি থানার পক্ষ থেকে ১২টি থানার ওষুধ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠানটির হেড অফিসে একটি বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এবং কয়েকটি বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতি হয়।

যে দুই প্রতিশ্রুতি ঘিরে মূল বিরোধ : কামাল হোসেনের দাবি, বৈঠকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দ্রুত একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তুলে নেওয়া এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সেগুলোর পরিবর্তে নতুন ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা ও সম্মতি হয়।

এ ছাড়া বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শর্তযুক্ত ‘স্ল্যাব’ পদ্ধতি না রেখে মোট বিক্রয়ের ওপর সরাসরি ইনভয়েসে ৩ শতাংশ সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাঁর অভিযোগ, বৈঠকে সম্মত এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। আর এ কারণেই কেমিস্টদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

কামাল হোসেন তাঁর পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন—বৈঠকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কোথায়? কথা দিয়ে কথা রাখা হলো না কেন?
‘আমরা কারও বিরুদ্ধে নই’: পোস্টে তিনি দাবি করেন, কেমিস্টদের অবস্থান কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। তাঁদের মূল দাবি ন্যায্য ব্যবসায়িক অধিকার এবং বৈঠকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।

তাঁর ভাষ্য, একটি স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও আস্থার ভিত্তিতে। একই সঙ্গে তিনি SK+F- এর নিজস্ব মূল্যবোধে ‘Integrity’ ও ‘Ethics’-এর উল্লেখ থাকার বিষয়টিও সামনে আনেন।

বয়কটের ঘোষণা : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনায় সম্মত বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত SK+F-এর ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পোস্টে ঘোষণা করা হয়েছে।

কামাল হোসেনের বক্তব্য : ‘দোকান আমার, ব্যবসার ঝুঁকি আমার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও আমার।’ ফলে কেমিস্টদের একটি অংশ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে সম্মিলিতভাবে এই অবস্থান নিয়েছেন বলে তিনি জানান।

প্রশ্ন উঠছে ব্যবসায়িক সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিয়ে : ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে মূল্যছাড়, ইনভয়েস সুবিধা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ফেরত ও প্রতিস্থাপন—এসব বিষয় সরাসরি ব্যবসায়িক আস্থা ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বৈঠকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকলে তার বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ যোগাযোগ থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, কামাল হোসেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাঁর বক্তব্য ও দাবির ভিত্তিতে প্রকাশিত। এসব অভিযোগের বিষয়ে SK+F কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা প্রয়োজন।

সমাধানের পথ কোথায়? : পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একদিকে কেমিস্ট ও ডিলারদের সঙ্গে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে ওষুধ সরবরাহব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই বিরোধকে সংঘাতে না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কামাল হোসেন তাঁর পোস্টে SK+F-এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—বৈঠকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন, কেমিস্টদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সম্মানজনক ও ন্যায্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

এখন দেখার বিষয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা এই ক্ষোভের পর SK+F কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর করা হয়। বিরোধের সমাধান আলোচনার টেবিলে হয়, নাকি কেমিস্টদের ঘোষিত বয়কট আরও বিস্তৃত হয় –সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *