নিজস্ব সদর দপ্তরে উঠতেই বিপত্তি, ৬০ কোটি টাকার বিপিসি ভবনে পানি ঢুকে ফাটল; ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ প্রকল্প পরিচালক আপেল মামুনের বিরুদ্ধে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালানোর পর অবশেষে নিজস্ব সদর দপ্তর পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। চট্টগ্রামের জয়পাহাড় এলাকায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচতলা এই ভবন। ইস্পাত কাঠামোর ভবনটিতে প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজ করার কথা। কিন্তু নতুন ভবনে অফিস শুরু হওয়ার পরপরই দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা। গত ১০ জুলাই ভবনে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১২ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস কার্যক্রম শুরু হয়। আর অফিস শুরুর দিনেই বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে ভবনের কয়েকটি কক্ষে। পানি ঠেকাতে কোথাও কোথাও ত্রিপল ব্যবহার করতে হয়েছে বলেও জানা গেছে। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সরকারি ভবনে এমন ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

পানি ঢোকার পর সামনে আসে ফাটলের বিষয়

ভবনে পানি প্রবেশের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বিভিন্ন স্থানে ফাটলের বিষয়টি সামনে আসে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভবনের উত্তর পাশে অন্তত তিনটি জায়গায় ফাটল দেখা গেছে। এর আগেও ভবনের কয়েকটি অংশে ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। পরে সেসব জায়গায় পুডিং ও প্লাস্টার করে মেরামত করা হয় বলে জানা গেছে। তবে প্রকল্প পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন এসব ফাটলকে বড় ধরনের ত্রুটি হিসেবে দেখছেন না। তাঁর দাবি, ভবনটি ইস্পাত কাঠামোর হওয়ায় ইস্পাত ও সিমেন্টের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। এগুলো কাঠামোগত বড় সমস্যা নয় এবং পুডিং ও প্লাস্টারের মাধ্যমে মেরামত করা হয়েছে।

অন্যদিকে ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মো. আমিনও ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইস্পাত কাঠামোর কারণে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা দিয়েছে। সেগুলো পুডিং করে ঠিক করা হচ্ছে এবং এতে ভবনের মূল কাঠামোর ক্ষতি হবে না।

নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন

ভবনে পানি ঢোকার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো. আপেল মামুন। তবে তাঁর ব্যাখ্যা, ভবনের কাচে বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার না করায় বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকেছে। এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠেছে—একটি নতুন সরকারি ভবনের কাচে প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা হলো না কেন এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে এসব বিষয় তদারকির সময় ধরা পড়েনি কেন?

প্রকৌশল ও নির্মাণসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ভবনে অফিস শুরুর পরপরই পানি প্রবেশ ও একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দেওয়া স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভবনের নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা, কাজের বাস্তবায়ন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এত বড় ব্যয়ের প্রকল্পে নির্মাণকাজের মান ঠিক ছিল কি না, তা কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা দরকার।

প্রকল্প পরিচালক আপেল মামুনকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

ভবনের ত্রুটির পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, ভবন নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. আপেল মামুনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং নির্মাণকাজের বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শুধু প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা নয়, আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনোভাবে জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি

বিপিসি প্রায় ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম চলে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর নিজস্ব ভবন পেলেও শুরুতেই পানি প্রবেশ ও ফাটলের ঘটনায় প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিপিসি দেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে এসব জ্বালানি বাজারজাত করা হয়। পাশাপাশি বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের কাজও হয়।

তাই প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সদর দপ্তরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী, কাজের মান, বিল পরিশোধ এবং প্রকল্প পরিচালকের তদারকি—সবকিছুই পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৌশলী মো. আপেল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন-বাণিজ্য ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপচয় ও নির্মাণকাজে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *