টেন্ডার থেকে সম্পদ—গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজির আলীকে ঘিরে যত অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলীকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, কমিশন লেনদেন, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সূত্র। এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরের সময়ে উজির আলীর কর্মস্থল ছিল মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি রাজধানীর বাইরে মাত্র প্রায় চার মাস দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স জোনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। একই কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উজির আলীকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে রাজধানীর আজিমপুরের একটি নির্মাণ প্রকল্পও। ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল রাতে আজিমপুর জাজেস কমপ্লেক্সে নির্মাণকাজ চলার সময় ১০ তলা থেকে পড়ে এক শ্রমিক নিহত হন। ওই সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে ছিলেন উজির আলী। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সুরক্ষা সরঞ্জাম যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নুরানী কনস্ট্রাকশনের নাম আসে। সূত্রগুলোর দাবি, একই সময়ে আজিমপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি কাজ চলছিল। এসব কাজকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে উজির আলীর কথিত কমিশন লেনদেনের বিষয়টি গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচিত ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি। ফলে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা, দায়িত্বে অবহেলা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মকর্তার কোনো আর্থিক যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজিমপুর কলোনিতে ২০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি ভবনের কাজ কুশলী নির্মাতা, তিনটি ভবনের কাজ মাসুদ অ্যান্ড কোং এবং চারটি ভবনের কাজ হাসান অ্যান্ড সন্সকে দেওয়া হয়েছিল। দরপত্র মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা যাচাই এবং কাজ বণ্টনের সময় নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় উজির আলী কয়েকজন ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন। তবে এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গেও উজির আলীর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সূত্রের দাবি, ওই প্রকল্পে তিনি প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গোপন তদন্ত কমিটির নথিতে ৩৭ কর্মকর্তার নাম থাকার কথা বলা হলেও সেখানে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং তদন্তের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ওই প্রকল্পে উজির আলীর ভূমিকা কী ছিল, তারও নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
আলোচনায় এসেছে আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামিমকে অতিরিক্ত বিল দেওয়ার ঘটনাও। ২০২১ সালে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের বিষয়টি তদন্তের জন্য যে কমিটি করা হয়েছিল, সেখানে উজির আলীর দায়িত্ব থাকার কথা জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনায় প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তুলনামূলকভাবে কম শাস্তি দিয়ে দায়মুক্ত করার ক্ষেত্রে উজির আলীর ভূমিকা ছিল। তবে এ অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন উজির আলী। তার বক্তব্য, তদন্ত কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল অতিরিক্ত দেওয়া অর্থ কীভাবে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ করা। কে দায়ী এবং কার বিরুদ্ধে কী শাস্তি হবে—সেটি নির্ধারণ করা ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, শতভাগ এপিপির কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ঠিকাদার সুবিধা পেয়েছিলেন এবং এর পেছনে কমিশন লেনদেনের সম্ভাবনাও ছিল। তবে এই অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তাই সিদ্ধান্তটি সরকারি বিধি মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না, দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছিল কি না এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
উজির আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো তার কথিত বিপুল সম্পদ। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র দাবি করেছে, তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডে তার একটি ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকে একটি ফ্ল্যাট এবং ধানমন্ডিতে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরে তার স্ত্রীর নামে প্রায় পাঁচ একর জমি থাকার দাবিও করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস, দলিলমূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য কিংবা সম্পদ ঘোষণায় এগুলোর তথ্য কীভাবে দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে উজির আলীর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তার রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, উজির আলী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি, মামলা এবং আদালতের রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জুলাই-আগস্টের সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কি না, সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
এত অভিযোগের মধ্যেও উজির আলী তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কখনো অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেননি। দপ্তর থেকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি সেটিই পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই বলেও তিনি দাবি করেছেন।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এসব অভিযোগের কতটা সত্য, আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিষয়টি পরিষ্কার করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। বিশেষ করে তার দীর্ঘ সময়ের পোস্টিং ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের নথি, দরপত্র অনুমোদন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত কাগজপত্র, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন এবং ব্যাংক লেনদেন যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
একই সঙ্গে আজিমপুর জাজেস কমপ্লেক্সে শ্রমিক নিহতের ঘটনা, আজিমপুর কলোনির ভবনগুলোর কাজ বণ্টন, কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার প্রকল্প, জি কে শামিমকে অতিরিক্ত বিল দেওয়ার ঘটনা, ফজলুল হক মধুকে দেওয়া শাস্তি, এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান এবং নুরানী কনস্ট্রাকশন, কুশলী নির্মাতা, মাসুদ অ্যান্ড কোং ও হাসান অ্যান্ড সন্সসহ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কথিত যোগাযোগ—সবকিছু আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
এখন নজর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দিকে। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, কমিশন গ্রহণ, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো একাধিক অভিযোগ উঠলে সেগুলো যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে উজির আলীকেও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত করার সুযোগ থাকতে হবে।
কারণ বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের ব্যবহার, সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা, ঠিকাদারি ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। তাই উজির আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—সেটি এখন বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা।
