বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগে প্রশ্নের পাহাড় : ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প, সম্পদ বিতর্ক ও দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ—সাইদুর রহমানের প্রতিবাদে কি মিলল সব প্রশ্নের উত্তর ?

বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং বিভাগকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন, দরপত্র ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক প্রভাব, সম্পদ অর্জন এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এসব অভিযোগের জবাবে তিনি লিখিত প্রতিবাদ দিয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিযোগ এবং প্রতিবাদ—দুই পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যার স্পষ্ট উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে জনস্বার্থে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নেত্রকোণার কংস ও ভোগাই নদী খনন প্রকল্পে প্রায় ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখানো হলেও প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থানে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ফিরে আসেনি এবং স্থানীয়ভাবে কাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, প্রকল্পের ব্যয়, বিল পরিশোধ, কাজের পরিমাপ এবং বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
এছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন, দরপত্র ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, বদলি ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পদ বিবরণী চেয়েছিল এবং অনুসন্ধানের কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা বা চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, মো. সাইদুর রহমান তাঁর লিখিত প্রতিবাদে দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদগুলো অনুমাননির্ভর, একপাক্ষিক এবং প্রকল্পের প্রকৃত কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনা না করেই প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নদী খননের পরও পলি জমা পড়া একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া; এটিকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখানো সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অনুমোদন, দরপত্র, কাজের পরিমাপ, বিল পরিশোধ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম সরকারি বিধি অনুসারেই সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর আয়-সম্পদ আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করবেন।
তবে তাঁর এই লিখিত প্রতিবাদ নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। যদি প্রকল্পের সব কাজ নিয়ম অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্প-পরবর্তী স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন বা অডিট প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন ?
যদি দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান বা সম্পদ যাচাই শেষ হয়ে থাকে, তাহলে তার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নিষ্পত্তির নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি?
যদি অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না ? আবার যদি অভিযোগগুলো তদন্তাধীন হয়ে থাকে, তবে তদন্ত শেষ হতে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন ?
একইভাবে, অভিযোগপক্ষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। প্রকল্প এলাকায় কাজ হয়নি—এই দাবির পক্ষে সর্বশেষ সরকারি জরিপ, স্যাটেলাইট তথ্য, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন কিংবা আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ কী রয়েছে? প্রকাশিত তথ্যের কতটুকু সরকারি নথি এবং কতটুকু অজ্ঞাত সূত্রের ওপর নির্ভরশীল ?
জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি এখন ব্যক্তি বনাম ব্যক্তির বিরোধ নয়; বরং এটি সরকারি অর্থ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জবাবদিহির প্রশ্ন। জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত বৃহৎ প্রকল্পে যদি কোনো অনিয়ম না ঘটে থাকে, তাহলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আবার যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি জনস্বার্থে কয়েকটি প্রশ্ন ও সুপারিশ উঠে এসেছে—কংস ও ভোগাই নদী খনন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি ? প্রকল্পের পরিমাপ বই (Measurement Book), বিল ভেরিফিকেশন, জিপিএস ও ড্রেজিং লগ স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুনঃযাচাই করা হবে কি ? অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদ যাচাই ও অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হবে কি ? দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রশাসনিক বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণক ছিল কি না—তা কি পর্যালোচনা করা হবে ? প্রয়োজনে উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, নদী বিশেষজ্ঞ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে কি ?
সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তখনই জনআস্থা অর্জন করবে, যখন অভিযোগ ও প্রতিবাদ—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে তথ্য, নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হবে। কারণ, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের প্রতিটি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের মুখে থাকা কোনো কর্মকর্তার ন্যায়সঙ্গত আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দিকে—তারা কি অভিযোগ ও প্রতিবাদের এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন ?
