বদলি না হওয়ায় গণপূর্তে প্রভাবশালী বলয়ের আধিপত্য; টেন্ডার, পদায়ন ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকা একাধিক প্রকৌশলীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, নিয়মিত বদলি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রায় ১৭০ জন নির্বাহী প্রকৌশলী, ৩০০ জন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, ২২০ জন সহকারী প্রকৌশলী এবং প্রায় ১২০০ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী কর্মরত রয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলির ক্ষমতা প্রধান প্রকৌশলীর হাতে থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে বড় ধরনের বদলি না হওয়ায় কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে, মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তারা মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ করে হতাশা প্রকাশ করছেন।

ই/এম শাখায় দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল/মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অনুযায়ী— নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. ইউছুফ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ই/এম কারখানা বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর ঢাকার বাইরে বদলি হলেও সেখানে যোগদান না করে রিজার্ভে ছিলেন।

পরবর্তীতে অল্প সময়ের মধ্যে আবার ঢাকার ই/এম বিভাগ-১৩ এবং পরে ই/এম বিভাগ-১ এ দায়িত্ব পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী মাশফিক আহমেদ প্রায় সাত বছর ঢাকার পিএন্ডডি জোনে স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ই/এম বিভাগ-২ এ দায়িত্ব পান এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে রয়েছেন বলে অভিযোগ।

নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম ই/এম বিভাগ-৩ এ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর ই/এম বিভাগ-৪ এ দায়িত্ব পান এবং বর্তমানে সেখানেই আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন দীর্ঘ সময় ঢাকায় কর্মরত থাকার পর সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাটের ঘটনায় বদলির মুখে পড়লেও পরবর্তীতে আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান বলে অভিযোগ।

এছাড়া মো. আবু তালেব, মো. তরিকুল আলম, মো. তামজিদ হোসেন, সমীরন মিস্ত্রী ও মো. জাহাঙ্গীর আলম-এর দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।

ই/এম বিভাগ-৫ ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভাগটিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী বলয় কাজ করছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, তার সময়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদার নির্বাচন, কমিশন বাণিজ্য এবং সরকারি কাজের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট চক্রের প্রভাব রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তামজীদ হোসেন দাবি করেছেন, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং তিনি সরকারি বিধি মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।

ই-জিপি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন :
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ই-জিপি (e-GP) ও আইবাস++ (iBAS++) ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করে বহিরাগতদের মাধ্যমে টেন্ডার, বিল ও আর্থিক নথির কাজ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ :
অভিযোগ রয়েছে, ই/এম বিভাগের বিভিন্ন কাজে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়। এসি, লিফট, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁকের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

তাদের দাবি, সাধারণ ঠিকাদারদের বিল দীর্ঘদিন আটকে থাকলেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এছাড়া কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, কাজ পেতে এবং বিল ছাড় করাতে ‘পার্সেন্টেজ’ দেওয়ার চাপ রয়েছে।

দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকা কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশ্ন :
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানাকে নিয়েও দীর্ঘদিন একই এলাকায় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে শেরেবাংলা নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অধীনে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান ও বাস্তবায়ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে ঘিরে প্রশ্ন : গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার-এর সময় বদলি, পদায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে।

কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তার আমলে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে বারবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শামীম আখতারের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

জিগাতলা কোয়ার্টারের কাজ নিয়ে অভিযোগ : জিগাতলা সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারের মাল্টিপারপাস হলে এলইডি ডিসপ্লে, কনফারেন্স সিস্টেম ও সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন সংক্রান্ত কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল প্রদান করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি :
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাদের মতে, নিয়মিত বদলি, সম্পদের হিসাব যাচাই, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী সময়মতো বদলি ও দায়িত্ব পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *