আর্জেন্টিনার জয়ে সামনে এল যে ৫টি বিষয়

ক্রীড়া ডেস্ক : এটাই যেন আর্জেন্টিনার অভ্যাস! নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছেন আর্জেন্টিনা। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন গতরাতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২–১ গোলের জয়ের ম্যাচে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে।
রদ্রিগো ডি পলে আর আস্থা নেই
নকআউট পর্বের আগের তিন ম্যাচে কঠিন পরীক্ষা দিতে হলেও স্কালোনি তাঁর মূল একাদশে বড় পরিবর্তন করতে চাননি।
তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি শেষ পর্যন্ত কৌশল বদলেছেন। রদ্রিগো ডি পলকে শুরুর একাদশ থেকে বাদ দিয়ে তিনি জুলিয়ানো সিমিওনেকে একাদশে নিয়ে আসেন। পূরণ করেছেন ডি পলের জায়গাটাও।
টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসির প্রথম গোলে ডি পলের অ্যাসিস্ট থাকলেও পুরো বিশ্বকাপে তিনি খুব সাধারণ ফুটবলই খেলেছেন। অবশ্য আর্জেন্টিনার পুরো মিডফিল্ডই এই বিশ্বকাপে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের দাপট তারা এবার দেখাতে পারছে না। দায়টা এনজো ফার্নান্দেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারেরও আছে। তবে সেটা বেশি ডি পলেরই।
গতকাল সিমিওনেও স্কালোনির সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন। দলে গতি ও কাউন্টার অ্যাটাকের শক্তি বাড়িয়েছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার পুরোনো কৌশলে আর্জেন্টিনা
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই দুই দলের মধ্যকার বৈরিতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। মাঠের লড়াই শুরু হতেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। এমনকি দুই দেশের সমর্থকেরাও একে অপরের জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় দুয়ো ধ্বনি দেন।
খেলার শুরু থেকেই বল ছাড়া আর্জেন্টিনার কৌশল স্পষ্ট ছিল, তা হলো প্রতিপক্ষকে ‘বিধ্বস্ত’ করা। মনে হচ্ছিল প্রত্যেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় শতবছরের পুরোনো সেই দক্ষিণ আমেরিকান কৌশলই ব্যবহার করছেন, ‘হয় বল পার হবে, না হয় খেলোয়াড় পার হবে, কিন্তু দুটো একসঙ্গে কখনোই নয়।’
ম্যাচের শুরুটা ইংল্যান্ড ভালোই করেছিল। কিন্তু আলবিসেলেস্তেরা একের পর এক ফাউল করে ম্যাচের গতি কমিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডও আর্জেন্টিনার পাতা ফাঁদে পা দেয়।
এই কৌশলে আর্জেন্টিনার অন্যতম সেনাপতি ছিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। বোকা জুনিয়র্সের এই মিডফিল্ডার এমন পরিস্থিতিতেই ভালো খেলেন। জুড বেলিংহাম এবং নিচে নেমে আসা হ্যারি কেইনকে একাই আটকে রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। তিনি সেটা করেছেনও।
রক্ষণে দুর্বলতা এখনো কাটেনি
কাতারে বিশ্বকাপ জেতা দলটার ওপরই মূলত এবার ভরসা রেখেছে আর্জেন্টিনা। তবে দলে রাইটব্যাক পজিশনে কোনো ভালো বিকল্প না থাকাটাকে আগে থেকেই বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সেমিফাইনালে নাহুয়েল মলিনা সেই ভয়টাকেই সত্যি প্রমাণ করেছেন।
টুর্নামেন্ট জুড়েই এই পজিশনে রিভার প্লেটের গঞ্জালো মন্তিয়েল ও মলিনাকে বারবার অদলবদল করেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। অথচ মলিনা গত মৌসুমে আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় মাত্র ১৩টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন।
স্কালোনি যাঁকে দিয়েই খেলা শুরু করিয়েছেন, তিনিই মাঠে ভুগেছেন। উল্টো বদলি হিসেবে যিনি পরে নেমেছেন, তিনিই ভালো খেলেছেন! এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল ও মিম বানাতে ছাড়েননি আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা।
সেমিফাইনালে মলিনা শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাচের ৫৫ মিনিটে তিনি এক মারাত্মক ভুল করে বসেন, যা আর্জেন্টিনার রক্ষণের আসল কঙ্কালটা বের করে আনে।
মর্গান রজার্সের বাড়ানো ক্রসের সময় মলিনা কেবল বলের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। নিজের পেছনে থাকা খেলোয়াড়কে মার্ক করতে পুরোপুরি ভুলে যান তিনি। এই সুযোগে অ্যান্থনি গর্ডন তাঁর পেছন থেকে এসে আলতো ছোঁয়ায় ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন।
আলবিসেলেস্তেরা শেষ পর্যন্ত মলিনার ভুল সামলে নিয়ে ম্যাচ জিতেছে। তবে এটা পরিষ্কার যে ফাইনালে স্পেন নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের চেপে ধরবে। বিশেষ করে স্কালোনির অরক্ষিত ডান দিকটাই হবে স্প্যানিশদের প্রধান লক্ষ্য।
ইংল্যান্ড দরজা খুলে দিল, সুযোগ নিলেন মেসি
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও প্রথমে গোল খাওয়াটাই আর্জেন্টিনার জন্য শাপেবর হয়েছে। ইংল্যান্ড কোচ গোল পাওয়ার পর দলকে পুরোপুরি ডিফেন্সিভ ও লো ব্লকে নিয়ে যান এবং রক্ষণাত্মক বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে আর্জেন্টিনার চাপকে আমন্ত্রণ জানান।
টুখেলের এই জুয়া মেক্সিকোর বিপক্ষে কাজে লেগেছিল। তবে আর্জেন্টিনা পুরোপুরি ভিন্ন দল, এই দলে মেসি ছিলেন। গোল হজমের পরই মেসি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এবং আর্জেন্টিনার পাল্টা–আক্রমণ পরিচালনা করতে শুরু করেন। তাঁর কিছু ক্রস থেকে আরও আগেও গোল আসতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত দুটি গোলে তিনিই সহায়তা করেন।
মেসির দ্বিতীয় অ্যাসিস্টটা ছিল দুর্দান্ত। ৩৯ বছর বয়সী মেসি উইং ধরে দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে যান। এরপর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে মার্তিনেজের জয়সূচক গোলের জন্য একটি নিখুঁত ক্রস ভাসিয়ে দেন।
দেখে মনে হবে মেসি যেন ২০০৬ সালে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপে খেলা ১৯ বছর বয়সী সেই তরুণ! আর্জেন্টিনার আরও একটি অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের জন্য হয়তো এ রকম কিছুরই প্রয়োজন ছিল।
পথের কাঁটা ফার্নান্দেজ
শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এনজো ফার্নান্দেজ মাঠে আগুন ঝরাবেন। ম্যাচের মাত্র ৩ মিনিটেই এলিয়ট অ্যান্ডারসনের মাথায় আঘাত করে নিজের আগ্রাসী রূপ দেখিয়েছেন তিনি। প্রথম ২৫ মিনিট এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে ফার্নান্দেজ একমুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেননি। অন্যদের জন্যও হয়েছেন বিরক্তির কারণ।
গোলের আগেও বেশ কয়েকবার দূর থেকে শটের চেষ্টা করেছেন ফার্নান্দেজ। তবে আসল ম্যাজিকটা দেখান ম্যাচের ৮৪ মিনিটে। তাঁর উদ্যাপনটাও ছিল দেখার মতো।
ফার্নান্দেজের পাশাপাশি তাঁর মিডফিল্ড সঙ্গী আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারও জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর দুটি দুর্দান্ত শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে তাঁর এই আক্রমণগুলোই ম্যাচের গতি বাড়িয়ে দিতে আর্জেন্টিনাকে তাতিয়ে দিয়েছিল।
