
এসএম বদরুল আলমঃ দেশের অন্যতম প্রধান প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ পদ—প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার দখলে নিতে ২০ কোটি টাকার এক গোপন চুক্তির অভিযোগ উঠেছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। মিরপুর, আজিমপুর ও মতিঝিলের সরকারি ফ্ল্যাট প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দীর্ঘদিন আলোচিত এই কর্মকর্তা এবার একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সহায়তায় পদোন্নতির মিশনে নেমেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মোসলেহ উদ্দিনকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে বসানোর লক্ষ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক উপদেষ্টা—মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর প্রধান আদিলুর রহমান খান শুভ্রর এক ঘনিষ্ঠ জুনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে ২০ কোটি টাকার গোপন চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) পদ থেকে তাকে মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে ‘চলতি দায়িত্বে’ নিয়োগ দিতে প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তুতি চলছে, যেখানে মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সরাসরি সহযোগিতা করছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে “ফিফটিন পার্সেন্ট” নামে কুখ্যাত মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। বলা হয়ে থাকে, তিনি প্রতিটি প্রকল্পে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন নেন। জাতীয় সংসদ ভবনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সংসদীয় কমিটির তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়, যদিও তা পরবর্তীতে ধামাচাপা পড়ে যায়। তিনি কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম) সিন্ডিকেটের একজন প্রভাবশালী সদস্য হিসেবেও পরিচিত।
২০০০ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে তলবি নোটিশ পাঠায়। নোটিশে বলা হয়, জি কে শামীমসহ বেশ কিছু ঠিকাদার সরকারি কর্মকর্তাদের শত কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাত ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি দুদক কার্যালয়ে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেন মোসলেহ উদ্দিন। সেখানে তাকে ঠিকাদার সিন্ডিকেট, বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জন বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
দুদক সূত্র জানায়, জি কে শামীমের গ্রেফতারের পর তার জিজ্ঞাসাবাদে মোসলেহ উদ্দিনের নাম উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষ ও অনিয়মের টাকায় তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি ক্রয় করেছেন এবং দেশে বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের সন্ধান মিলেছে।
মোসলেহ উদ্দিনের কর্মজীবনজুড়ে রয়েছে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সুবাদে তিনি প্রশাসনিক পদে ওঠার পর থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিয়েছেন বলে সহকর্মীরা অভিযোগ করেন। বিএনপি সরকার আমলে কিছুটা কোণঠাসা থাকলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও তার প্রভাব বাড়ে। তার আপন ভাই নাদিম বর্তমানে পুলিশের এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যিনি ন্যাব-৮ ও এসবিতে কর্মরত ছিলেন।
বিসিএস ১৫তম ব্যাচের এই প্রকৌশলী ১৯৯৫ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগ দেন। ফেনী ও শেরেবাংলা নগরে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত হয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি কর্মস্থলেই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তিনি রেহাই পাননি। এমনকি গণপূর্তের ঠিকাদার সমিতি ও কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে দুদকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
দুদক সূত্র আরও জানায়, মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগের প্রমাণ ও নথিপত্র সংস্থাটির হাতে রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় তিনি নিজেকে “বঞ্চিত কর্মকর্তা” হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিকভাবে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে তিনি বিসিএস ১৫তম ব্যাচের গ্রেডেশন তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন। প্রথম স্থানে থাকা সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম দুর্নীতির অভিযোগে অপসারিত এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলামকে ডিঙিয়ে তিনি এই পদে বসতে চান—যা বর্তমান সরকারের নীতির পরিপন্থী বলে মনে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান শুভ্র বলেন, “এগুলো সম্পূর্ণ অপপ্রচার। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিভিন্ন মহল থেকে তদবির থাকলেও আমরা গণপূর্ত অধিদপ্তরকে অস্থিতিশীল করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
তবে কর্মকর্তাদের দাবি, মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তার পরও তাকে শীর্ষ পদে বসানোর চেষ্টা গণপূর্ত অধিদপ্তরকে আরও কলুষিত করবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা