বিশেষ প্রতিবেদকঃ কৃষি পর্যটনের নামে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রিসোর্ট নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। প্রচার করা হয়েছিল শত একর জমির ওপর গড়ে উঠবে বিলাসবহুল বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে বিনিয়োগ করলেই মিলবে নিয়মিত উচ্চ মুনাফা। চটকদার প্রচারণা, আকর্ষণীয় প্যাকেজ এবং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির আশ্বাসে এগিয়ে এসেছিলেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নই অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ‘অ্যাগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পের নামে পরিচালিত ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে উঠেছে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকল্পের আড়ালে পরিচালিত হয়েছে একটি বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) ধাঁচের অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রম, যেখানে নতুন সদস্য যুক্ত করার ওপরই ছিল মূল গুরুত্ব।
উচ্চ মুনাফার প্রলোভন, বিনিয়োগে আকৃষ্ট হাজারো মানুষ : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৩ লাখ, ৬ লাখ এবং ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিভিন্ন বিনিয়োগ প্যাকেজ চালু করে। এসব প্যাকেজে নির্দিষ্ট সময় পরপর আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করতে পারলে দেওয়া হতো কমিশন ও বিশেষ বোনাস। ফলে অনেকেই নিজের সঞ্চয়, জমি বিক্রির অর্থ কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার টাকা এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শুরুতে কয়েক মাস নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন মূল টাকা ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের চেয়ে সদস্য সংগ্রহেই বেশি গুরুত্ব ? অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে প্রকৃত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের তুলনায় নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং কমিশনভিত্তিক আয়ের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় যদি মূলত নতুন সদস্য যুক্ত করার ওপর নির্ভর করে এবং প্রকৃত পণ্য বা সেবাভিত্তিক ব্যবসা দুর্বল থাকে, তাহলে সেটি পিরামিড বা অবৈধ এমএলএম কাঠামোর ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
১০০ বিঘা জমির প্রকল্প, বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন : বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শিবপুরের কামারগাঁও এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর আধুনিক রিসোর্ট নির্মাণের প্রচারণা চালানো হয় বলে অভিযোগ।
তবে কয়েকজন বিনিয়োগকারী দাবি করেছেন, প্রচারিত জমির মালিকানা, প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে তারা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রচারণায় দেখানো নানা নকশা ও ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপথ্যে কারা ? উঠছে কয়েকজনের নাম : ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামছুল আলম সজলের নেতৃত্বে একটি চক্র এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত এম আর খানসহ কয়েকজন ব্যক্তি এই কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া নারী বিনিয়োগকারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সালমা আক্তার (মনি) নামের এক নারীর ভূমিকার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গুলশান কার্যালয় নিয়েও প্রশ্ন৷ : বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন জানান, রাজধানীর গুলশান এলাকায় একটি কার্যালয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পর যোগাযোগের চেষ্টা করলে অনেক সময় কার্যালয় বন্ধ পাওয়া যায়।
একই এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যবসা নিয়েও নানা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ : এক ভুক্তভোগী বলেন, “উচ্চ মুনাফার আশায় জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছি না।” আরেক বিনিয়োগকারীর ভাষ্য, “প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের আস্থা তৈরি করা হয়েছিল। এখন যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে গেছে।”
বক্তব্য পাওয়া যায়নি : ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামছুল আলম সজল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোন এবং কার্যালয়ের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি : ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের আইনগত অনুমোদন, আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদের মালিকানা এবং ব্যবসার বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা জরুরি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা