বিশেষ প্রতিবেদকঃ পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলার তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ১৫ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, পিরোজপুরে দায়িত্ব পালনকালে আব্দুস সাত্তার হাওলাদার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, কাজ না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া কাজ দেখানো এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় বাস্তবে কাজ না করে মোট ১ হাজার ৭৯ কোটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক পৃথক আটটি মামলা করেছে। এসব মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজসহ এলজিইডির সাবেক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আরও ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের আগের একটি তদন্তেও এলজিইডির ১৭টি প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। ওই তদন্তে প্রকল্পগুলোর মোট চুক্তিমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং ঠিকাদারদের পরিশোধ করা অর্থ প্রায় ৩ হাজার ১৭৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। কাজের হিসাব পর্যালোচনায় প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
আব্দুস সাত্তারের নিজের নামে বড় ধরনের সম্পদের তথ্য না পাওয়ায় অনুসন্ধানের শুরুতে দুদকের কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন মনে হয়। পরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখতে গিয়ে স্ত্রী রীনা পারভীন এবং দুই ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। দুদকের দাবি, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করতেই পরিবারের সদস্যদের নামে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়ে থাকতে পারে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী গ্রামের মো. আব্দুল গনি হাওলাদারের ছেলে আব্দুস সাত্তার হাওলাদার ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এলজিইডিতে বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক একাধিক মামলা করে তদন্ত শুরু করে।
অনুসন্ধানে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী রীনা পারভীনের নামে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। রীনা পারভীন নিজেকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর নামে বড় কোনো বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধান নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী পৌরসভার আরামবাগ এলাকায় রীনা পারভীনের নামে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার পান্থপথ এলাকার ফেয়ার দিয়া কমপ্লেক্সে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা দিয়ে ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া পশ্চিম আগারগাঁওয়ের আবেদীন ড্রিমস প্রকল্পে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্য রয়েছে।
জমি, ফ্ল্যাট ও ভবন মিলিয়ে রীনা পারভীনের নামে প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের হিসাব পেয়েছে দুদক। এর সঙ্গে ব্যাংকে থাকা অর্থ, গাড়ি কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগসহ আরও প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ পাওয়া গেলেও দুদকের হিসাবে গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ মাত্র ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে প্রায় ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদ তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু স্ত্রী নয়, আব্দুস সাত্তারের দুই ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক। অনুসন্ধান নথি অনুযায়ী, এসব সম্পদ অর্জনের সময় দুই ছেলেই ছাত্র ছিলেন। তাঁদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপরও তাঁদের নামে জমি, অন্যান্য স্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, বড় ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাতের নামে প্রায় ১২ লাখ ৫৭ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ এবং প্রায় ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। ছোট ছেলে ফজলে রাব্বি রিমনের নামে রয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার স্থাবর এবং প্রায় ৭৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ। সব মিলিয়ে দুই ভাইয়ের নামে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের অভিযোগ, রিফাতের নামে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং রিমনের নামে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ তাঁদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের নামে আয়কর নথিও খোলা হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে ওই সম্পদের বিপরীতে বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে দুদক।
মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের স্বাক্ষরিত বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে তাঁদের সহসভাপতি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগও ওঠে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রিফাত ও রিমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
বরগুনা জেলা ছাত্রদলের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম রনি বলেন, তিনি ওই কমিটির তালিকা দেখেছেন, তবে রিফাত ও রিমনকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তাঁদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে এবং প্রশাসনের কাছে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে বলেও তিনি জানান।
দুদকের পিরোজপুরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হয়েছে। আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধেও নয়টি মামলা এবং তাঁর স্ত্রী রীনা পারভীনের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বরগুনার পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা জানান, রিফাত ও রিমনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা বেশির ভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং এলাকায় এলে অল্প সময়ের জন্য কর্মসূচি করে আবার চলে যান। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো স্থান থেকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার নথিতে উঠে আসা এসব তথ্যের ভিত্তিতে আব্দুস সাত্তার হাওলাদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে মামলাগুলোর তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্ত শেষে দুদকের প্রতিবেদন ও আদালতের সিদ্ধান্তেই অভিযোগগুলোর আইনগত পরিণতি নির্ধারিত হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা