আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় প্রতিদিন গড়ে একজন শিশু প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল(ইউনিসেফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর থেকে গত ৩০০ দিনে গাজায় অন্তত ৩০০ শিশু নিহত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার(৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, একই সময়ে শত শত শিশু আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই গুরুতর। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোর প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের জন্য ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক এডুয়ার্ড বেইগবেডার বলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গড়ে প্রতিদিন একটি করে শিশু প্রাণ হারায়, তা শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। গাজার শিশুরা এখনও সেই সহিংসতার অবসানের অপেক্ষায় আছে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিল।
সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিবারগুলো এখন অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনার স্তূপের মাঝে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুরা তীব্র অপুষ্টি, রোগব্যাধি, অনিরাপদ পানি ও ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকটের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি ইনকিউবেটরের অভাবে অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া একাধিক নবজাতককে একই মেশিন ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ওই অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধে ৭৩,৩০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ৫৮,০০০-এরও বেশি শিশু তাদের বাবা-মায়ের একজনকে বা উভয়কেই হারিয়েছে এবং ১০ লাখেরও বেশি শিশুর সুরক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। সংস্থাটি এর আগে অনুমান করেছিল, প্রায় ১৭,০০০ শিশু অভিভাবকহীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম বড় শিশু সুরক্ষা সংকট। অনেক পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুতি, আয়-রোজগার হারানো এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষার সীমিত সুযোগের মধ্যে জীবনযাপন করছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ আগস্ট পশ্চিম গাজা সিটিতে চালানো এক হামলায় এক গর্ভবতী নারী, তার স্বামী ও তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে নিহত হন; হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই নারীর গর্ভস্থ অনাগত সন্তানের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি ত্রাণকর্মীরা এমন এক প্রজন্মের কথা তুলে ধরেছেন যাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের তৃতীয় গ্রীষ্মকাল চলছে; অথচ খেলাধুলার বদলে অনেক শিশুকেই পানি সংগ্রহ, খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কাজে দিন কাটাতে হচ্ছে। ইউনিসেফ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মতে, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরগুলোতে গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প, ছবি আঁকার সরঞ্জাম, এমনকি কাগজ ও কলমেরও তীব্র সংকট রয়েছে।
মে মাসে ইউনিসেফের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজায় ছোট শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও উদ্দীপক পরিবেশের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি, স্কুল-বয়সী শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনায় ব্যাঘাতের শিকার হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট সহায়তা ছাড়া এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
ইউনিসেফের ফিলিস্তিন বিষয়ক যোগাযোগ প্রধান জোনাথন ক্রিক্স চলতি বছরের শুরুর দিকে বলেছিলেন, যুদ্ধ শিশুদের কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে, খেলাধুলার মাধ্যমেই তারা তা ফিরে পায়। তিনি খেলাধুলাকে বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন।
সংঘাত অবসানের পদক্ষেপ এবং ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে সাম্প্রতিক ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বেইগবেডার। তিনি বলেন, গাজার শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই সহজ। হত্যাযজ্ঞ কি থামবে? তাদের কাছে কি পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাবে? হাসপাতালগুলো কি আবার চালু হবে এবং পানি সরবরাহ কি স্বাভাবিক হবে?
আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইউনিসেফ চলতি সপ্তাহে ৬০০ প্যালেটেরও বেশি স্কুল-সামগ্রী ও সাবান সরবরাহ করেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা