
এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মাসুম বিল্লাহ এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই এক অপ্রতিরোধ্য নাম। শেরেবাংলা নগর ৩নং উপবিভাগে দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা পদ, প্রভাব এবং অর্থের জোরে গড়ে তুলেছেন এমন এক প্রভাববলয়, যা ভাঙা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাসুম বিল্লাহ ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগর ইউনিয়নের কাঠিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা ইউনুস আলী ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন সদস্য। ছাত্রজীবনে বুয়েটে পড়ার সময় থেকেই মাসুম বিল্লাহ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর আশীর্বাদে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকরি পান — যদিও তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা বিতর্ক রয়েছে।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় তার দ্রুত উত্থান। রাজনৈতিক আশীর্বাদে একের পর এক লোভনীয় পোস্টিং, পদোন্নতি এবং প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের দুর্নীতির সাম্রাজ্য। গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ ও কমিশনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৬ সালে তিনি নগর গণপূর্ত বিভাগের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ আছে, ওই সময়ে তিনি আওয়ামী ঘরানার ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিতেন। তিনটি অর্থবছরে এভাবে তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা উপার্জন করেন বলে অভিযোগ সূত্র জানায়।
পরে পদোন্নতি পেয়ে মিরপুর উপবিভাগ-২ এ দায়িত্ব নেন মাসুম বিল্লাহ। সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পে অ্যাডভান্স বিল, ভুয়া ভাউচার ও বিল জালিয়াতির মাধ্যমে আরও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। অভিযোগ আছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম আড়াল করে রাখা হতো।
মিরপুরে দীর্ঘ চার বছর থাকার পরও তার স্থান বদল হয়নি। পরবর্তীতে আমির হোসেন আমুর সুপারিশে আবারও ঢাকা শহরের ভেতরেই — এবার শেরেবাংলা নগর ৩নং উপবিভাগে — নতুন দায়িত্ব পান তিনি। সেখানে ঠিকাদারি ও ঘুষ বাণিজ্য আরও বিস্তৃত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিলেও, মাসুম বিল্লাহ এখনো একই পদে বহাল রয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ ও বঞ্চিত ঠিকাদারদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন — এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে গণপূর্ত প্রশাসনই দায় এড়াতে পারবে না।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাসুম বিল্লাহ রাজধানীতে উত্তরা, বনশ্রী ও সাভারে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট কিনেছেন। নিজ এলাকা রাজাপুরে তার পরিবারের নামে প্রায় ১০০ বিঘা জমি ক্রয় করা হয়েছে। বাবা-মা, স্ত্রী, বড় ভাইসহ আত্মীয়স্বজনের নামে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তার বড় ভাই সফিউল বসর একজন কাস্টমস কর্মকর্তা। দুই ভাই মিলে গ্রামে ভাঙ্গা টিনের ঘর ভেঙে এখন ডুপ্লেক্স বাড়ি তৈরি করেছেন। স্থানীয়রা জানান, তারা একসময় অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার ছিলেন; অথচ বর্তমানে তাদের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ২০ কোটি টাকারও বেশি।
গত ৫ অক্টোবর রাতে তাদের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। গ্রামবাসীর দাবি— ডাকাতরা ১৫-২০ কোটি টাকা ও শতাধিক ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। কিন্তু থানার এজাহারে তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখান মাত্র “১৩ ভরি সোনা ও ৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা”। স্থানীয়দের ধারণা, বৈধ উৎস না থাকায় তারা প্রকৃত পরিমাণ গোপন করেছেন।
এর আগেও মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন তার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর ও কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মাসুম বিল্লাহ ও তার ভাই সফিউল বসর নিজেদের “আমির হোসেন আমুর আত্মীয়” হিসেবে পরিচয় দিতেন। এ কারণে অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতেন না।
একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর মতামত পাওয়া যায়নি। তার অফিস ও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা