নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় মেট্রোরেলের ৩২০ নম্বর পিলারের পাশে প্রায় পাঁচ কাঠা জমি। জমিটির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছেন আপন দুই ভাই। এক পক্ষের দাবি—বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে তার বৈধ অংশ রয়েছে। অন্যদিকে, জমিটি দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে ছোট ভাই মো. আলমগীর হোসেন ওরফে অ্যাপোলোর বিরুদ্ধে।
এই বিরোধকে কেন্দ্র করে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছেন বড় ভাই আলহাজ্ব মো. মুকুল আমিন। একই সঙ্গে জমিতে নির্মাণকাজের বৈধতা, রাজউকের অনুমোদিত নকশা এবং সেখানে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের কতটা সত্য, জমিটির প্রকৃত মালিকানা কার এবং বর্তমানে আইনগতভাবে কার দখলে থাকার কথা—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতাও পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বড় ভাইয়ের অভিযোগ
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মিরপুর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুকুল আমিন অভিযোগ করেন, শেওড়াপাড়ার ৫৯৩/এ এলাকার ওই জমি তাদের বাবা মৃত আলহাজ্ব আব্দুল মালেকের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটিতে তার বৈধ মালিকানা রয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে তাকে জমিটির দখল ও ভোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ছোট ভাই আলমগীর হোসেন অ্যাপোলো কয়েকজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জমিটি দখলে রেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মুকুল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধ শুধু জমির মালিকানা ও দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর জেরে তার ও পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকির ঘটনাও ঘটেছে।
এ ঘটনায় আব্দুস সালাম, আরিফ, রুহুল আমিন, আব্দুল আলিম ও আতিকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি।
প্রশাসনের কাছে অভিযোগ, কিন্তু সমাধান কোথায়?
মুকুল আমিন দাবি করেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে থানাসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তার প্রত্যাশিত প্রতিকার মেলেনি।
এখানেই উঠছে প্রশ্ন—জমিটির মালিকানা নিয়ে প্রকৃত বিরোধ কী এবং জমির কাগজপত্রের ভিত্তিতে কার দাবি আইনগতভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য?
এ বিষয়ে ভূমি-সংক্রান্ত দলিল, নামজারি, খতিয়ান, দখল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন
জমিটিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠেছে নির্মাণকাজ নিয়ে।
মুকুল আমিনের দাবি, বিরোধ চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সেখানে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই সঙ্গে তার প্রশ্ন—জমিতে বর্তমানে যে কোনো নির্মাণকাজ পরিচালিত হলে তা রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী হচ্ছে কি না।
এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও অনুমোদন যাচাই। বিশেষ করে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের অনুমতি এবং কর্তৃপক্ষের দেওয়া কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নির্দেশনা থাকলে তার বাস্তবায়নের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
রাতের কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগ
মুকুল আমিন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগের বরাত দিয়ে দাবি করেন, ওই জমি ও আশপাশের এলাকায় রাতে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। সেখানে মাদক, ইয়াবা কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
তবে সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের বিষয়টি জানা গেলেও, রাতের বেলায় মাদক বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তই হতে পারে নির্ভরযোগ্য উপায় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনের পর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংবাদকর্মীরা সরেজমিনে ওই এলাকায় গেলে সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ সময় দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদকর্মীদের প্রবেশের বিষয়ে আপত্তি জানান বলে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের অভিযোগ। ফোনালাপে কর্মচারীদের সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলার অভিযোগও ওঠে।
ওই কথোপকথন সংবাদকর্মীরা রেকর্ড করেছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণ এবং সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছিল—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে মুকুল আমিন তার ভাই আলমগীর হোসেন অ্যাপোলোর রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীতের প্রভাব নিয়েও অভিযোগ করেন।
তিনি দাবি করেন, অ্যাপোলো জার্মান শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন মুকুল আমিন।
এ ছাড়া ৭ আগস্ট রাতে অ্যাপোলো দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব রাজনৈতিক ও অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অ্যাপোলোর দেশত্যাগের দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো আদালতের রায় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অ্যাপোলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি
মুকুল আমিনের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে মো. আলমগীর হোসেন ওরফে অ্যাপোলোর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি কিংবা তিনি জমিটি কোন আইনি ভিত্তিতে দখলে রেখেছেন—এসব বিষয়ে তার অবস্থান জানা গেলে বিরোধটির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
পাঁচ কাঠা জমির বিরোধকে ঘিরে বর্তমানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
- জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও উত্তরাধিকারসূত্রে অংশীদারিত্ব কার কতটুকু?
- মুকুল আমিনের দাবি করা দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্রের আইনগত অবস্থান কী?
- বর্তমানে জমিটির দখল কার এবং কোন আইনি ভিত্তিতে?
- জমিতে কোনো নির্মাণকাজ হয়ে থাকলে সেটি রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কি না?
- কাজ বন্ধ রাখার কোনো সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তা মানা হয়েছিল কি না?
- জমি নিয়ে হামলা, হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে কোনো মামলা বা তদন্ত হয়েছে কি না?
- এলাকায় মাদক বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড, রাজউকের অনুমোদন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মুকুল আমিন বলেন, “আমার জমির কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও আমি আইনগত সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমি চাই প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত মালিকানা ও দখলের বিষয়টি নির্ধারণ করুক।”
স্থানীয়দেরও দাবি, জমিটির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের সব নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হোক। পাশাপাশি মাদক বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সারকথা, শেওড়াপাড়ার এই পাঁচ কাঠা জমির বিরোধ এখন কেবল দুই ভাইয়ের পারিবারিক সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দখল, নির্মাণকাজের বৈধতা, হুমকি এবং কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা অভিযোগ। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও উভয় পক্ষের বক্তব্য ছাড়া কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা