বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম উদ্যোগ ‘ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ বাস্তবায়ন ঘিরে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের কারণে কৃষি বিভাগের একটি অংশে তাকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে সমালোচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ, সার ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভুয়া কৃষকের তালিকা তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী খামার স্থাপনের নামে বিল তোলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেসব খামারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে ভুয়া ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে নিম্নমানের বীজ ক্রয় করে তা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।
কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের পরিবর্তে স্বল্প সময়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত না হলেও ভুয়া উপস্থিতি তালিকা ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া টিএ/ডিএ বাবদ সরকারি কর্মকর্তাদের নামে অর্থ উত্তোলন করা হলেও প্রকৃত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
প্রকল্পের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যেসব কর্মকর্তা বিতর্কিত নথিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি, তাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ ও সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই কৃষি বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে অভিহিত করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প নিয়ে একাধিক অডিট আপত্তি ও লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারীদের ধারণা, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে এসব অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ৪ আগস্ট ২০২৪ সালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আন্দোলনকারীদের দমনে শফিকুল ইসলাম সক্রিয় ছিলেন। তাদের ভাষ্য, পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে ছাত্রদলের ত্যাগী ও বঞ্চিত কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি টেন্ডারে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার দাবি করেন, এমন শর্ত আরোপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই সুবিধা পাবেন। তার ভাষ্য, বিগত ১৫ বছরে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক ঠিকাদার কাজের সুযোগ পাননি, ফলে নতুন শর্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করার কথা বলে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সীমিত সংখ্যক পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ কারণে প্রকল্পের টেন্ডার বাণিজ্যের অনেক বিষয় প্রকাশ্যে আসে না।
সম্প্রতি বিএডিসির প্রকৌশলীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা দাবি করেন।
ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অনিয়মের এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অর্থ ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা