বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসেক বিল্লাহকে ঘিরে ঘুষ গ্রহণ, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টম হাউসের এয়ারফ্রেইট ইউনিটে দায়িত্ব পালনের সময় ওয়াসেক বিল্লাহ পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন। বিশেষ করে ‘ডেলিভারি গেট-১’ কেন্দ্র করে আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, পণ্যের ধরন ও চালানের ওপর নির্ভর করে ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত শুল্ক-কর পরিশোধ, আমদানি-সংক্রান্ত শর্ত এবং পণ্যের সঠিক ঘোষণা যথাযথভাবে যাচাই না করেই কিছু চালান খালাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা পণ্য, উচ্চ শুল্কের পণ্য এবং আমদানিতে বিধিনিষেধ রয়েছে—এমন পণ্য নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত ধরন বা পরিমাণ গোপন করে কম শুল্ক পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এতে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। পাশাপাশি যারা নিয়ম মেনে শুল্ক ও কর পরিশোধ করে ব্যবসা করেন, তাদের সঙ্গে অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া আমদানিকারকদের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে গত ছয় মাসে ঘুষ ও রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এই বিপুল অর্থের দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি বা কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট চালান, বিল অব এন্ট্রি, শুল্ক-কর পরিশোধের রেকর্ড এবং অর্থনৈতিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে শুধু ঢাকার দায়িত্বকালের অভিযোগই নয়, কর্মজীবনের আগের সময় নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ভ্যাটের অধীন বান্দরবান সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান পরিচালনার নামে হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কী ধরনের অভিযোগ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো তদন্ত করেছিল কি না, তা সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ওয়াসেক বিল্লাহ টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালন করার সময়ও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় তিনি একটি মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। কাঠের গুঁড়ি ও আচারের প্যাকেটের আড়ালে মাদক পরিবহনের একটি চক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে টেকনাফের এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো মামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের সত্যতা জানতে সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নথি, মামলার তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগের আরেকটি অংশে রাজধানীর উত্তরার ‘কিংফিশার বার’-এর সঙ্গে ওয়াসেক বিল্লাহর সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে লাইসেন্স ও অনুমোদনের বিষয়েও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
তবে এই দাবির পক্ষেও মালিকানা সংক্রান্ত দলিল, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে এটিও অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ওয়াসেক বিল্লাহর সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগে রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় তার নামে ৩৩ শতাংশ জমি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খতিয়ান নম্বর ৩৬৪৯৭ উল্লেখ করে ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ওয়াসেক বিল্লাহর বৈধ আয় ও সম্পদের বিবরণীর সঙ্গে ওই জমির মূল্য এবং মালিকানা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। এ ক্ষেত্রে তার আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ক্রয়মূল্য, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পত্তি কেনার অর্থের উৎস পরীক্ষা করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
বিশেষ করে একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু সম্পত্তির পরিমাণ দেখলেই বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। সম্পদটি বৈধ আয়ে কেনা হয়েছে কি না, ক্রয়মূল্য কত ছিল এবং অর্থের উৎস কী—এসব তথ্য যাচাই করাই মূল বিষয়। একইভাবে কারও নামে থাকা সম্পত্তি তার প্রকৃত মালিকানাধীন কি না, সেটিও দলিল ও আর্থিক নথি দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকা কাস্টম হাউসের ‘ডেলিভারি গেট-১’-এর গত কয়েক মাসের কার্যক্রম খতিয়ে দেখলে অভিযোগের বাস্তব চিত্র পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য ওই সময়ের বিল অব এন্ট্রি, পণ্যের ঘোষণা, মূল্যায়ন নথি, শুল্ক-কর পরিশোধের তথ্য এবং পণ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে কোন আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের চালান ওয়াসেক বিল্লাহর দায়িত্বাধীন সময়ে খালাস হয়েছে, সেসব চালানের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং কোনো চালানে অস্বাভাবিকভাবে কম শুল্ক পরিশোধ করা হয়েছে কি না—সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
পণ্য খালাসের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন, অনুমোদনের ধাপ এবং প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজও পরীক্ষা করা যেতে পারে। এতে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি আছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা প্রায় ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের দাবির বিষয়টিও পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন। কোন কোন চালানে কত টাকার রাজস্ব কম আদায় হয়েছে, তার সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে কোনো অনিয়মিত যোগাযোগ ছিল কি না—এসব তথ্য তদন্তের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হতে পারে।
অভিযোগকারীরা ওয়াসেক বিল্লাহর ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং তার নিজের ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, চাকরির আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে আর্থিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেটি চিহ্নিত করা সম্ভব।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায়ে ওয়াসেক বিল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয় সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস, রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের অভিযোগ সত্য কি না, তা জানতে কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। একইভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ যাচাইয়ে আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির দলিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যাও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি তার বর্তমান দায়িত্বের পাশাপাশি কর্মজীবনের আগের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। এখন দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিভিত্তিক অনুসন্ধানেই নির্ধারিত হতে পারে—ঘুষ গ্রহণ, পণ্য খালাসে অনিয়ম, রাজস্ব ফাঁকি, পূর্বের কর্মস্থলের অভিযোগ এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়ে করা দাবিগুলোর কতটা সত্যতা রয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা