নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আবাসন ও ডেভেলপার ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়টি নথিপত্র ও আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মিজান, উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু, সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আবুল বাসার, উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আব্দুর রউফ এবং সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) গুলনাহারের বিরুদ্ধে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে। তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মিজানুর রহমান মিজান। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিষ্ঠানটির প্রচারসামগ্রী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মিজানুর রহমানের দুই ভাই প্রতিষ্ঠানটির বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়ে পরবর্তীতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। মোহাম্মদপুরের বসিলা-ওয়াশপুর, মিরপুর-১-এর গৈলারটেক, উত্তরা দিয়াবাড়ি এবং সাভার ডিওএইচএস-নবীনগরসহ বিভিন্ন এলাকার ঠিকানা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কোম্পানির মালিকানা, পরিচালনা, আর্থিক লেনদেন এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
আবুল বাসার ও গুলনাহারকে ঘিরেও অভিযোগ
গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আবুল বাসারের বিরুদ্ধে ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড-এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আবুল বাসারের স্ত্রী সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) গুলনাহারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নথি, মালিকানা কাঠামো এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন।
আব্দুর রউফের বিরুদ্ধেও আবাসন ব্যবসার অভিযোগ
উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আব্দুর রউফের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির বিষয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় কোনো কর্মকর্তা যদি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসায় প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখেন, তাহলে সেখানে সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আনোয়ার খান আনুকে ঘিরে ভিন্ন অভিযোগ
উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সাভার গণপূর্ত ডিভিশনে কর্মরত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়ন ও জমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া সাভার এলাকার সরকারি জমিতে দোকানপাট ভাড়া বা পজিশন দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়নি।
মূল প্রশ্ন আচরণবিধি ও স্বার্থের সংঘাত
সরকারি কর্মচারীর ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে প্রচলিত আচরণবিধিতে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রকৌশলী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ সত্য হলে তাঁরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে কোনো সরকারি কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত খাতের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তাই শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোম্পানির মালিকানা, পরিচালক বা অংশীদারিত্ব, ব্যাংক লেনদেন, সম্পত্তি, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং ফ্ল্যাট বিক্রির নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।
অভিযোগের নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কি না—এ বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী, কোম্পানির মালিকানা ও পরিচালক তালিকা, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রকল্পের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি দীর্ঘদিন অভিযোগের পর্যায়ে ঝুলিয়ে না রেখে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অবসান—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তেই
এ পর্যন্ত আলোচিত অভিযোগগুলোর কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখানে নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে সরকারি দায়িত্ব পালনরত কোনো কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেসরকারি ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন কি না, থাকলে সে বিষয়ে অনুমোদন ছিল কি না এবং সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে ওই ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই।
ফলোআপ প্রতিবেদনের মূল প্রশ্ন এখন একটাই—অভিযোগ, নাকি প্রমাণ?
আর সেই উত্তর বেরিয়ে আসতে পারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নথি, সরকারি রেকর্ড, সম্পদ বিবরণী ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা